যুবদের জন্য ফাউন্ডেশন

মানবিক সমাজ গড়তে জেন-জির উদ্যোগ

ফারজানা রুনা

মানবিক সমাজ গড়তে জেন-জির উদ্যোগ

শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা কত মানুষকেই না দেখি—কেউ ফুটপাতে রাত কাটায়, কেউ খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকে, কেউ আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে রাস্তাকেই বানায় আশ্রয়। তাদের পাশ দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ চলে যায়; কেউ তাকায়, কেউ তাকিয়েও না দেখার ভান করে।

যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে যখন চারপাশের মানুষ ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতার চোরাবালিতে, যখন স্বার্থপরতার দেওয়ালগুলো আরো উঁচু হচ্ছে, ঠিক তখনই একদল তরুণ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বুনে দিতে। তারা প্রমাণ করেছে, পকেটে অঢেল টাকা না থাকলেও কেবল বুকভরা ভালোবাসা আর তীব্র সদিচ্ছা দিয়ে সমাজটাকে বদলে দেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

টাঙ্গাইলের মাটি থেকে যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা দেশের ৩২টি জেলায় ডানা মেলেছে, ছড়াচ্ছে একঝাঁক তরুণের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আলো। এটি স্রেফ কোনো সংগঠন নয়, বরং সংকটের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা মশাল। আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগে ২০১১ সালের এক সকালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চোখে আলোর স্বপ্ন বুনে দিতে তরুণ সমাজকর্মী মুঈদ হাসান তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশু সংগঠন ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন’। একই সময়ে শুরু হয় ‘স্বপ্নপুরী’ নামের একটি ভিন্নধর্মী স্কুল। উদ্দেশ্য ছিল খুব সাদামাটা—যেসব শিশুর কোমল হাতে বই থাকার কথা ছিল, অথচ জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় তারা ঝরে পড়েছে, তাদের আবার অক্ষরের আলোয় ফেরানো। একটি ছোট ঘর, একমুঠো স্বপ্ন আর মানুষের জন্য কিছু করার অবাধ্য জেদ—এই তিনের রসায়নেই ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘যুবদের জন্য ফাউন্ডেশন’।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো অভাব নয়, একাকিত্ব। যখন অসুস্থ শরীর নিয়ে কেউ রাস্তার পাশে পড়ে থাকেন, পরিচয়হীন বলে যাকে কেউ হাসপাতালে নেয় না, তখন তার পাশে দাঁড়ানোটা মানবতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। সেই পরীক্ষায় বারবার নিজেদের দাঁড় করিয়েছে এই সংগঠন। অজ্ঞাত, বেওয়ারিশ, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ, এমনকি মৃত্যুর পর দাফন-কাফনের দায়িত্বও পালন করছে তারা।

সমাজে সবচেয়ে নীরব কান্নাগুলোর একটি হয়তো বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের। যাদের হাত ধরে একদিন সন্তান বড় হয়, অনেক সময় তারাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়ে পড়েন অবহেলার শিকার। রাস্তার পাশে থাকা বৃদ্ধদের চিকিৎসা, খাবার ও সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রমেও নিয়মিত পৌঁছে যাচ্ছে সংগঠনটির মানবিক উদ্যোগ।

এই ফাউন্ডেশনের সুন্দর দিক তাদের উদ্ভাবনী ভাবনা। তারা সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে কেবল দান করে ছোট করতে চায়নি, বরং তাদের আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে চালু করেছে ‘১০ টাকার হোটেল’, ‘১০ টাকার ইফতার’, ‘১০ টাকার বই’ এবং ‘১০ টাকার কাপড় বাজার’। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে যখন একজন খেটে খাওয়া মানুষ পেট পুরে খাচ্ছেন কিংবা রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন, তখন তার মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফোটে, তার মূল্য কোটি টাকা দিয়েও পরিমাপ করা অসম্ভব।

তাদের এই মহৎ কাজ শুধু সাময়িক সাহায্য বা ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল ভিত্তি হলো মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো, তথা স্বাবলম্বী করে তোলা। দুস্থ নারীদের সেলাই মেশিন, কর্মহীন পুরুষকে ছাগলছানা, হাঁসের বাচ্চা এবং পিঠার দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে তারা তৈরি করছে নতুন জীবনের গল্প। এ পর্যন্ত সাতশ’র বেশি মানুষকে সরাসরি এবং অনলাইনের মাধ্যমে প্রায় আট হাজার বেকার যুবককে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। এমনকি এই তরুণেরা প্রকৃতির ক্ষত নিরাময়েও সমান দূরদর্শী। পরিবেশ রক্ষায় এ বছর তারা পাঁচ হাজার গাছ রোপণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ‘প্লাস্টিকের বদলে গাছ’ কিংবা অভিনব ‘বীজ বোমা’ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তারা তৈরি করেছে এক জাদুকরী ‘বীজ কলম’, যে কলম দিয়ে লেখা শেষ হলে মাটিতে পুঁতে দিলেই জন্ম নেয় একটি নতুন প্রাণ, একটি নতুন গাছ। যেন প্রতিটি অক্ষরের সমাপ্তির পর জন্ম নিচ্ছে একেকটি নতুন জীবন!

সংকট যখনই সমাজকে গ্রাস করেছে, তারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। করোনাকালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা আমরা কি ভুলে গেছি? যখন আপন সন্তানেরা সংক্রমণের ভয়ে বাবার লাশ ফেলে পালাচ্ছিল, তখন এই ফাউন্ডেশনের বীরেরা সম্মুখযোদ্ধা হয়ে মাঠে ছিল। আটশ’র বেশি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া, লকডাউনের স্তব্ধ শহরে জীবন বাজি রেখে অক্সিজেন সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে যাওয়া এবং করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকারের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো তারা করেছিলেন বুক চিতিয়ে। বন্যা কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রান্না করা খাবার ও ওষুধ নিয়ে দুর্গত এলাকায় হাজির হওয়া, কিংবা ২ হাজার ১০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে মুমূর্ষু রোগীকে বিনা মূল্যে পৌঁছে দিয়েছে।

শিক্ষা নিয়ে তাদের ভাবনাও ব্যতিক্রম। প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিচালিত সপ্তপদী বিদ্যালয় শুধু একটি স্কুল নয়, এটি বহু শিশুর নতুন জীবনের দরজা। যে শিশুরা একসময় সমাজের প্রান্তে ছিল, তাদের কেউ কেউ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যেন একটি বই, একটি খাতা আর একটি সুযোগ বদলে দিয়েছে জীবনের গতিপথ।

সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে মুঈদ হাসান তড়িৎ বলেন, “এ বছর যুবকদের জন্য ফাউন্ডেশন সারা বাংলাদেশে আট হাজার যুবক-যুবতীকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘প্লাস্টিক দিন গাছ নিন’ স্লোগানে আমরা গাছ বিতরণ করব। এরই মধ্যে আমরা নতুন একটি আন্দোলন শুরু করেছি। এটি হচ্ছে ‘একজন মানুষ, একটি গাছ’ আন্দোলন, যে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই একজন মানুষ যেন বছরে অন্তত একটি গাছ লাগায়। স্বাবলম্বী প্রকল্পের আওতায় এ বছর অন্ততপক্ষে ৫০ জনকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পার্বত্য জেলাগুলোয় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। এ বছর আমরা প্রায় পাঁচ হাজার গাছ রোপণ করব। ১০ টাকায় গাছ, ১০ টাকায় বই, ১০ টাকায় সবজি বীজ, ১০ টাকায় চিকিৎসা, শীতবস্ত্র বিতরণ, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় অঞ্চলে কার্যক্রম প্রভৃতি নানা পরিকল্পনা বছরব্যাপী গ্রহণ করা হয়েছে।”

টাঙ্গাইলের এই সাধারণ তরুণদের অসামান্য যাত্রা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয়, কবি কামিনী রায়ের সেই চিরন্তন বাণী—

‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...