আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্বপ্ন অনেক দূর…

রেদ্ওয়ান আহমদ

স্বপ্ন অনেক দূর…

১৯৯৭ সাল। গাইবান্ধা সদরের উত্তর ফুলিয়া গ্রামে জন্ম নিল ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান। সন্তানের দিকে মায়ের অপলক দৃষ্টি। সে কী আবেগ-উচ্ছ্বাস! আনন্দে আত্মহারা সবাই। কিন্তু ‘ভাগ্যের লিখন যায় না খণ্ডন’ প্রবাদবাক্যকে আবারও সত্য প্রমাণ করলেন তিনি। যাকে দেখে চোখ জুড়াতেন সবাই তার নিজেরই কিনা দৃষ্টিশক্তি নেই। তাই বলে কি সেখানেই থেমে গিয়েছিল জীবন? নাকি দীপ্ত পায়ে হেঁটে চললেন তিনি? দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও কীভাবে উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন মো. শরিফুল ইসলাম, সেই গল্প জানবো।

বিজ্ঞাপন

ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্ট, শহীদমিনার কিংবা লেডিস ঝুপড়িতে প্রায়ই দেখা যায় একজনকে, যিনি খাতা-কলম বিক্রি করেন। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০ টাকা পর্যন্ত নানা দামের নানা রকমের খাতা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পরিবেশ-সহায়ক কাগজের কলমও বিক্রি করেন তিনি। বলছিলাম ‘শরিফুল পেপার হাউজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শরিফুল ইসলামের কথা। সুদূর গাইবান্ধা থেকে এনে চবি ক্যাম্পাসে কাগজ-কলমের ব্যবসা করছেন।

শরিফুলের হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম দেখলে মনেই হবে না তিনি একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি। তার আছে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো এক সুন্দর স্বপ্ন। শরিফুল জানেন এই পথে আছে নানা প্রতিবন্ধকতা। তবুও চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনা তাকে অস্থির করে তোলে। ভাবতে থাকেন, নিজের এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া যায়। ভাবতে ভাবতে সত্যিই প্রতিষ্ঠা করেন ‘শরিফুল পেপার হাউজ’।

ছোটবেলায় শরিফুল বুঝতে পারেন তার জীবন আর ১০টি মানুষের মতো নয়। প্রতিজ্ঞা করেন পড়ালেখা করবেন। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় একেক করে টপকাতে থাকেন স্কুলের গণ্ডি। সঙ্গী তার চিরবন্ধু ব্রেইল পেপার আর এক রেকর্ডার। এরই মধ্যে ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাস করেন। ভর্তি হন গাইবান্ধা সরকারি কলেজে। সেখানে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন শরিফুল। কিন্তু তাকে থামলে তো হবে না। স্বপ্নের দৃষ্টি যে অনেক দূর। ২০১৭ সালে শরিফুল উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। জীবনের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্পের আরেক ধাপ শুরু হয় এখান থেকেই।

শরিফুল বলেন, চাকরির নিশ্চয়তা কম, তাই আমি স্নাতকের প্রথম থেকেই ব্যবসার কথা ভাবি। নিজের একটা স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। সেই থেকেই কাগজের এই ব্যবসা।

অন্যসব ব্যবসা রেখে খাতা-কলম বা কাগজের ব্যবসা কেন—এমন প্রশ্নে বলেন, অনেকগুলো ব্যবসার চেষ্টা করেছি। ওষুধের ব্যবসা করেছি, কাপড়ের ব্যবসার কথাও ভেবেছি। কিন্তু ওগুলো আমার জন্য উপযোগী নয়। শেষ পর্যন্ত কাগজের ব্যবসা শুরু করি। কেননা এটা আমার জন্য উপযোগী এবং তুলনামূলকভাবে সহজ। নিজে নিজে করা যায়, অন্যের সহযোগিতার কম দরকার পড়ে।

তবে শরিফুল এমন ব্যবসা করতে চান না, যা পরিবেশের ক্ষতি করে। তাই প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজের কলম বিক্রির পরিকল্পনা নেন, যা পরিবেশের ক্ষতি করবে না এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। শরিফুল কলমের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’, যা সবুজ পরিবেশের জন্য সহায়ক। আর খাতার নাম দিয়েছেন ‘পদ্মা সেতু’।

এরই মধ্যে শরিফুল বসেন বিয়ের পিঁড়িতে। শরিফুল ইসলামের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় সহযোগী তানিয়া। তিনিও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। শরিফুল বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, ব্যবসা খুব ভালো চলছে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতে আমার তেমন কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। যখন খাতা শেষ হয়, আমি এলাকায় গিয়ে একসঙ্গে প্রায় কয়েক হাজার খাতা-কলম বানিয়ে নিয়ে আসি। এক্ষেত্রে আমাকে তিনজন মানুষ সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেন। আমার এলাকার স্টেশনারি ব্যবসায়ী ডাইজু ভাই, কাগজ ব্যবসায়ী দুলাল মামা আর আমার স্ত্রী।

খাতার প্রচ্ছদ ডিজাইন, লেখা ও ভুলত্রুটি সংশোধন নিয়ে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী তানিয়া সব ধরনের সহযোগিতা করেন। খাতার প্রচ্ছদ করার সময় আমি প্রথমে একটা কাল্পনিক ডিজাইন করি। তারপর সেটা ডিজাইনারকে বললে তিনি ডিজাইন করে দেন। ডাইজু ভাই, দুলাল মামা আছেন, তাদেরকে দেখাই, ভুলত্রুটি থাকলে সংশোধন করে দেন। এছাড়া চোখে না দেখলেও কাগজ ধরে চেক করতে করতে এখন একদম বুঝে গেছি কোনটা কোন মানের, কোনটার দাম কত।

ক্যাম্পাসে দোকান পরিচালনা আর খাতা-কলম বিক্রির বিষয়ে শরিফুল জানান, ক্যাম্পাসে আমি একাই দোকান চালাই। খাতা-কলমও খুব ভালো বিক্রি হয়। ২০২৩ সালের শেষ ছয় মাসে আমার প্রায় সাড়ে তিন হাজার খাতা বিক্রি হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশের এই গোলযোগপূর্ণ সময়েও আড়াই হাজার কপি খাতা বিক্রি হয়েছে। মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার খাতা-কলম বিক্রি হয়।

স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান গড়তে অবিরাম পরিশ্রম করছেন শরিফুল। তবে উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রায় পরিবার থেকে উৎসাহ না পেলেও কখনও কেউ বাধা দেননি।

ক্যাম্পাসে কাগজের ব্যবসা করতে গিয়ে কোনো ধরনের বাধা বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হইনি। সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন। যখন কেউ খাতা কিনে নেন, তখন জিজ্ঞেস করে নিতে হয়—এটা কত টাকার নোট? তাছাড়া কাঁচামাল সংগ্রহের সময় ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হয়। এগুলোই মোটামুটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানালেন শরিফুল। তিনি বলেন, ‘শরিফুল পেপার হাউজকে বড় করাই আমার স্বপ্ন। আগামী দিনে বাজারের অন্যান্য কাগজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে।’ সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাগজে যদি সরকার প্রণোদনা দিত, তাহলে আরেকটু লাভ করতে পারতাম। তা ছাড়া আমার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো মূলধনের সংকট। সেই জায়গায় সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে স্বপ্নটা খুব সুন্দর করে বাস্তবায়ন করতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: