‘ইংরেজ প্রায় দুশো বছরের শাসন-শোষণে একটা জিনিস করতে সক্ষম হয়েছিল যে, মুসলমানরা মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং চর্চায় একটা যে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল সেটা প্রায় মুছে ফেলা।’ (ভূমিকা, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, ইফাবা প্রকাশনা, জুন ১৯৯৮)
এ মন্তব্যের পর বাংলা সাহিত্যের আধুনিক গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্য জাগরণ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের মফস্বল শহর ঢাকা রূপান্তরিত হলো বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন রাজধানীতে। তাই দেখা যাবে, ১৯৪৭ সালের পর ঢাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পের এক সার্বিক জাগরণ। বাংলা সাহিত্যের হাজার দেড়েক বছরের ইতিহাসে বাঙালি-মুসলমানদের জন্য এত বড় জাগরণ আর হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি হিসেবে কল্লোলিনী কলকাতার যে ভূমিকা ছিল, মধ্য-বিংশ শতাব্দীতে ঢাকা গ্রহণ করল সেরকম একটি ভূমিকা।’
উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতার লেখক, অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন হিন্দু। আর মধ্য বিশ শতকের ঢাকা ছিল মুসলমানপ্রধান। এ বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার ব্যাখ্যাতারা কেন মুখ ফুটে বলেন না—এ হচ্ছে স্পষ্টবাদী গবেষক মান্নান সৈয়দের জিজ্ঞাসা।
মান্নান সৈয়দ বলেন, ’৪৭-এর দেশ বিভাগের পর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই আমাদের জীবন ও সাহিত্যের এবং সংস্কৃতির মহত্তম ঘটনা। সাহিত্য, চিত্রকলা, নৃত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র, সংগীত—প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের নবজাগরণের সাড়া পড়েছিল। কলকাতায় শুরু হওয়া নবজাগরণ পূর্ণতা পায় ঢাকায়। এসময় বাংলাদেশে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনা, গবেষণা—সবকিছুতেই অগ্রগতি সূচিত হয়েছিল। সে ছাপে মৌলিক ঐতিহ্যকেও অস্বীকার করা হয়নি, বর্তমানের অঙ্গীকারও আছে।
মান্নান সৈয়দ ওই প্রবন্ধে আরো উল্লেখ করেন, উভয় বাংলার ভাষা অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাহিত্যে নিজস্ব বিশিষ্টতার ছাপ রয়ে গেছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ অকপটে তুলে ধরেন মুসলিম মনীষীদের অবদানের ইতিহাস। উনিশ শতকের প্রধান দু মনীষী নবাব আবদুল লতিফ ( ১৮২৬-৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮)। নবাব আবদুল লতিফ ছিলেন সাহিত্যামোদী ও সংস্কৃতিমান মানুষ; ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের সহপাঠী ও বন্ধু। ১৮৬৩ সালে কলকাতায় নবাব আবদুল লতিফ প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’। সৈয়দ আমীর আলী ১৮৭৮ সালে কলকাতায় স্থাপন করেন ‘ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’। বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩১) কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামে মুসলমান মহিলাদের সংস্থা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রচেষ্টায় ১৯১১ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। এতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মোজাম্মেল হক (ভোলা), এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। পরে যুক্ত হন তৎকালীন সুধীশ্রেষ্ঠ খানবাহাদুর আহছানউল্লা, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, কমরেড মুজাফফর আহমদ, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ, শেখ আবদুর রহিম, মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর), কাজী ইমদাদুল হক, শেখ হবিবুর রহমান, মঈনউদ্দীন হোসায়ন প্রমুখ।
১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় সমিতির মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’। এ পত্রিকায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘মুক্তি’ কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। এর প্রধান ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ।
আবদুল মান্নান সৈয়দ যথার্থই লিখলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে বিজয় পূর্ণ হলো বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠায়, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সওগাত, মোসলেম ভারত, সাম্যবাদী, শিখা, মাসিক মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকার দৌলতে নজরুল ইসলাম এবং একদল মননশীল লেখকের আবির্ভাবে।’
উল্লেখ্য, ১৯১১ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পর ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলা একাডেমি। ১৯২৭ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) কণ্ঠেই প্রথম বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত হলো ‘মুসলমানি ঢং’-এর আবশ্যকতার কথা।
প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধদের সৃষ্ট। আর মধ্যযুগে বাঙালি মুসলমান রোমান্স কাব্যের মধ্য দিয়ে মানবিকতার সূচনা করেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানদের অবদানের বিষয়ে বলতে গিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ খোলাসা করেন, ১৯৪৭ সাল থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক যে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, তা-ই বাংলা সাহিত্যের আবশ্যিক দিক। প্রকৃতপক্ষে বিশ শতকের শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমান সাহিত্য জাগরণে ঝুঁকে পড়ে। এ সময় সামাজিক রাজনৈতিক ভাবনাই ছিল তাদের জন্য মুখ্য।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল থেকে শুরু করে তিরিশের ও চল্লিশের কবি লেখকরা এবং তৎকালীন সাময়িকীগুলোর ভূমিকা ও অবদান যাচাই করলে প্রতীয়মান হয়, একই বাংলায় দু স্বতন্ত্র ধারা প্রবাহিত ছিল।
মান্নান সৈয়দ জোর দিয়ে বলেন, এমনকি হিন্দু-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত নজরুল ইসলামও বিস্ময়করভাবে প্রধানত প্রকাশিত হয়েছেন মুসলিম সম্পাদিত পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথ ও মুনশি মেহেরুল্লাহর জন্ম একই বছরে (১৮৬১)। মান্নান সৈয়দ বলেন, ‘কিন্তু সার্বভৌম কবি রবীন্দ্রনাথের বহুধা কর্মের মধ্যে তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সেক্রেটারি, আর ‘মুসলিম বাংলার রামমোহন’ (মুহম্মদ আবদুল হাই) মুনশি মেহেরুল্লাহর ধ্যান জ্ঞান ছিল ইসলাম প্রচার। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৭) ও আনোয়ারা উপন্যাসের প্রণেতা নজিবর রহমান (১৮৭৮-১৯২৩) ছিলেন সমসাময়িক।’
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা শিখা গোষ্ঠীর উত্থান ১৯২৬ সালে। শিখা গোষ্ঠীর প্রধান কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৬-১৯৭০) কোরআন শরিফের অনুবাদ ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী রচনা করেছেন। নজরুল বাংলা ইসলামি গানের স্রষ্টা এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নির্মাতা।
বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য জাগরণে আবদুল মান্নান সৈয়দের আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের অকাট্য ধারাবাহিকতা। মান্নান সৈয়দ বলেন, বিষাদ সিন্ধু, মহাশ্মশান ও অশ্রুমালার রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন এক অসাধারণ লেখক। তাছাড়া মোজাম্মেল হকের জোহরা উপন্যাস, নজিবর রহমানের আনোয়ারা, ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ, বেগম রোকেয়ার পদ্মরাগ প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। নজরুল-পূর্ব ভালো কবিতা লিখেছেন শাহাদাৎ হোসেন ও গোলাম মোস্তফা।
মুনশি মেহেরুল্লাহ থেকে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী পর্যন্ত অন্তত ২০ জন উঁচুদরের কবি, লেখক, সম্পাদক ও গবেষকের নাম উল্লেখ করে মান্নান সৈয়দ দুঃখের সঙ্গে জানান, প্রমথনাথ বিশী ও বিজিতকুমার দত্ত সম্পাদিত বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক (দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৬৫) সংকলন গ্রন্থে রামরাম বসু থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত গদ্য লেখকদের দেড়শ বছরের ইতিবৃত্ত ও নমুনা সংগৃহীত হয়েছে, কিন্তু একজন মুসলমান লেখকও উল্লিখিত হননি।
মান্নান সৈয়দের মতে, আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে নজরুল চারজন শ্রেষ্ঠ কবির একজন। বাকি তিনজন—মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশ। মধ্যযুগে কাজী দৌলত বা সৈয়দ আলাওলের মতো বড় কবির জন্ম হলেও আধুনিক কালে নজরুলের সমকক্ষ কেউ নেই।
তিরিশের কবিদের পর ফররুখ আহমদ সবচেয়ে বড় কবি। আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ঔপন্যাসিক। স্বনামধন্য রম্য রচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলী, নজরুল গবেষক আবদুল আজিজ আল আমান, কবি সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ বাংলা কবিতা ও সাহিত্যের ঈর্ষণীয় প্রবাদ পুরুষ।
দীনেশচন্দ্র সেন থেকে আনিসুজ্জামান অবধি বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যকৃতির যে বিশ্লেষণধারা প্রবাহিত, তার যোগ্য উত্তরসূরি কবি সমালোচক গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ। বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্য জাগরণ ও অবদান তার গবেষণায় অপূর্ব ঝলকিত হয়ে উঠেছে। তাই বাংলা গবেষণা সাহিত্য এ ক্ষণজন্মা গবেষণা পুরুষের কাছে চিরঋণী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


‘হ্যাঁ’ ভোট মানে হচ্ছে, আগামীর স্বাধীন সাংবাদিকতা : এম আবদুল্লাহ