আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঈদ : মুসলিম সংস্কৃতির চিরায়ত ঐতিহ্য

মাহমুদ আহমাদ

ঈদ : মুসলিম সংস্কৃতির চিরায়ত ঐতিহ্য
ছবি: সংগৃহীত

সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও পরম্পরাগত ঐতিহ্য বিনির্মাণের লক্ষ্যে ইসলামে ‘ঈদ-উৎসব’ প্রবর্তন করা হয়েছিল। আরবিতে ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ ব্যাপক। এই শব্দের মধ্যে সম্মিলন, আয়োজন, প্রত্যাবর্তন ও উদ্‌যাপনের অর্থ রয়েছে। তাই ঈদের অর্থ হয় মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত আনন্দঘন একটি দিন, যেদিনটি আয়োজন, উদ্‌যাপন ও সম্মিলনের মাধ্যমে অতিবাহন করা হয়।

আল্লাহর রাসুল (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসে সর্বপ্রথম যে কাজগুলো করেছেন এবং যে সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অর্জন। সে সময় মদিনায় নওরোজ ও মেহেরজানের মতো উৎসবের প্রচলন ছিল।

বিজ্ঞাপন

যেখানে এমন অনেক আয়োজন হতো, ইসলামের বিচারে যার বৈধতা ছিল না। আর এই সব উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোও সেভাবে আলোকিত হয় না। ফলে নবীজি (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাদের নিজেদের রীতিনীতি মোতাবেক উৎসব পালনের জন্য নির্দিষ্ট দিবস রয়েছে। ইসলাম তাদের থেকে সার্বিক দিক থেকে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করতে চায়। আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অর্জনের লক্ষ্যে দুটি দিনকে আমি ঈদ-উৎসব হিসেবে ঘোষণা করছি।

muslim-2

নবীযুগে তাই ঈদ আয়োজনে উৎসবের আমেজ থাকত। মদিনার মেয়েরা সংগীতের আয়োজন করত, হাবশিরা বর্শার খেলা দেখাত, মদিনায় সৌহার্দ্যপূর্ণ আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করত।

খিলাফত রাষ্ট্রে ঈদ

উমাইয়া খেলাফতের যুগে ঈদ উদ্‌যাপন ক্রমে আরো বর্ণিল ও আড়ম্বরপূর্ণ রূপ লাভ করে। এ সময় ঈদ-উৎসবের সঙ্গে নানা নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয়। উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল খলিফা ও প্রাদেশিক শাসকদের জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা, যা জনসাধারণের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করত।

ঈদ উপলক্ষে ঘোড়দৌড় ও শিকারের আয়োজনও ছিল সে সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন। একই সঙ্গে পোশাক-পরিচ্ছদেও লক্ষ করা যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ইয়েমেন ও কুফা থেকে আগত উৎকৃষ্ট মানের ‘ওয়াশি’ বা নকশাদার বস্ত্রের পোশাক পরিধান ছিল অভিজাতদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রচলিত। এই সময়কার পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সূক্ষ্ম ও নান্দনিক বুননশৈলী।

এছাড়া উন্নত মানের খাদ্য ও সমৃদ্ধ ভোজের আয়োজনও উমাইয়া যুগে ঈদ উদ্‌যাপনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে পরিগণিত হতো, যা উৎসবের সামগ্রিক আড়ম্বর ও আনন্দকে আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করত।

সালতানাতে বাংলায় ঈদ

হেকিম হাবিবুর রহমান, একেএম শাহনেওয়াজ ও অন্যদের লেখা থেকে জানা যায়, শহর হিসেবে ঢাকা সুলতানি আমল অথবা তারও আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঢাকায় ব্যাপক পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলত। আরব পারস্য ইরান তুরানের মতো দূর-দূরান্তের অঞ্চল থেকে বণিকেরা এখানে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসত। এই সকল বণিকদের অনেকেই ছিলেন মুসলিম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় একটি বৃহত্তর মুসলিম কমিউনিটি গড়ে ওঠেছিল। তারা স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস করত। ধর্মীয় দায়িত্ব পালন ও শিক্ষার বিস্তারের জন্য তারা একাধিক মসজিদ গড়ে তুলেছিল। তখন মুসলিম সমাজে মসজিদের গুরুত্ব ছিল বহুমুখী। একটি মসজিদ তখন ছিল মুসলিম সমাজের স্বকীতার প্রতীক, শিক্ষার বিস্তার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। ঢাকায় সুলতানি আমলে নির্মিত বেশ কয়েকটি মসজিদের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং এর কয়েকটি মসজিদ এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

সুলতানি আমলে ঢাকায় মুসলিম সমাজের বিকাশ থেকে জানা করা যায়, সেখানে ঈদের মতো ধর্মস্বীকৃত উৎসব পালনের রেওয়াজ নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে সেকালে ঈদ পালনের ধারা ও প্রকৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

ঈদ উদ্‌যাপনের মোগল রীতি

মোগল-বাংলায় ঈদ উদ্‌যাপনের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখায়। মির্জা নাথান ছিলেন মোগল অ্যাডমিরাল, যিনি ইসলাম খানের সঙ্গে বাংলায় এসেছিলেন। ইসলাম খানকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করার আগে সুবে বাংলার রাজধানী ছিল বিহারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল রাজমহল বা আকবরাবাদ। ইসলাম খান ভাটির ভূঁইয়াদের দমন করার জন্য ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেন। মির্জা নাথান যখন রাজমহল থেকে নৌবাহিনী নিয়ে ভাটির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, তখন পথের কোনো এক স্থানে রমজান ও ঈদ উদ্‌যাপন করেছিলেন।

muslim-3

তিনি বাহারিস্তানে গায়েবি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে (ঈদের) নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিবিরে রাজকীয় বাজনা বেজে উঠল এবং আগ্নেয়াস্ত্র ক্রমাগত অগ্নি উদ্‌গিরণ করে চলল। রাতের শেষভাগে আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ থেমে গেল। এর স্থলে ভারী কামানের অগ্নি উদ্‌গিরণ শুরু হলো। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প।’

বাংলা অঞ্চলে ঈদ উদ্‌যাপন প্রসঙ্গে ‘নওবাহারে মুর্শিদকুলী খান’ গ্রন্থের রচয়িতা আজাদ হোসেন বিলগ্রামী বলেন, “নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা ‘ঈদগাহ’ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানরা তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ-আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাত।”

নতুন, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা হলো ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ। ঈদের আমেজকে বাড়িয়ে তুলতে নতুন কাপড় পরিধান করার প্রচলন মুসলিম শাসনাধীন বাংলাতেও ছিল। ঈদের দিন মুসলিম নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়ে সবাই সুন্দর পোশাক পরিধান করত। এটাই ইসলামের আদর্শ ও নির্দেশনা।

ঈদকে কেন্দ্র করে ঈদগাহের আশপাশে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হতো। হাজার হাজার লোকের সমাগম হতো সেসব মেলায়। সেখানে থাকত খাওয়া-দাওয়ার অপূর্ব সব আয়োজন।

তাওয়ারিখে ঢাকা গ্রন্থের প্রণেতা মুনশী রহমান আলী তায়েশ বলেন, ‘(বর্তমান ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার) ঈদগাহে বাংলার নাজিম ও সুবেদাররা তাদের পরিবারের লোকজন ও শহরবাসীদের সঙ্গে নিয়ে দুই ঈদের নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এ ঈদগাহ শহরের এলাকা থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে রায়বাজারে অবস্থিত।’

আগে এ এলাকা শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজকাল এটি অত্যন্ত ভগ্নাবস্থায় আছে এবং আশপাশের মুসলমান ও শহরের অধিকাংশ লোক ওখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। শহরের মুসলমান মৎস্য ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর ওখানে একটি মেলার আয়োজন করেন। এতে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয় এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা চলে।

হেকিম হাবিবুর রহমানের বর্ণনায় চাঁদরাত ও ঈদ মিছিল

আল্লাহর রাসুল (সা.) ঈদের চাঁদ দেখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। খোলা স্থানে গিয়ে চাঁদ দেখার বিষয়ে সাহাবিদের তিনি উৎসাহিত করেছেন। নবীযুগের সেই রেওয়াজ বাংলা অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ‘ঢাকা পাচাশ বরস প্যাহলে’ গ্রন্থে হেকিম হাবিবুর রহমান চাঁদ দেখার বর্ণনা দিয়েছেন। তবে সেটা তিনি রমজান প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এরপর চাঁদ দেখার প্রস্তুতি নেওয়া হতো। বড় কাটারা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটারা ও হোসেনী দালানের মতো উচ্চ অট্টালিকার ছাদে অনেক আগে থেকেই লোকজন পৌঁছে যেতেন এবং অতি শৌখিন লোকেরা নৌকার সাহায্যে মধ্য নদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। কিশোর ও যুবক সবাই চাঁদ দেখতে যেত। বিশেষ করে বৃদ্ধ-বয়সি লোকেরা নিজের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য অবশ্যই যেতেন। আমরাই সবচেয়ে প্রথমে চাঁদ দেখেছি—এটা বলার জন্য আবার সচেষ্ট থাকত। অবশেষে চাঁদ দেখা গেল, খুশির এক রব উঠল এবং একে অপরকে মোবারকবাদ দিত। বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হতো। তোপধ্বনি করা হতো। এতে চারপাশ এমন সরব উঠত যে, বধিরও জেনে যেত যে চাঁদ উঠেছে। ছোটরা বড়দের সালাম দেওয়ার জন্য আসত এবং দোয়া নিয়ে যেত।’

এরপর তিনি ঢাকার ঈদ মিছিলের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘পরিশেষে ঈদ মিছিলের আকারে সংগীতের ঝরনা প্রবাহিত হতো। ঈদের দ্বিতীয় দিন এই মিছিল বের করা হতো। প্রথম দিকে এটা ছিল সাদামাটা মিছিল, কিন্তু এখন রমজান মাসের সাহরির জন্য ডাকনেওয়ালারা, অর্থাৎ ক্ষীরে লবণ দেওয়ার লোকেরাও এর অংশীদার হয়ে গেছে। এই মিছিল চকবাজার থেকে বের হয়ে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, নবাবপুর ও বংশালের মধ্য দিয়ে চকবাজারে এসে শেষ হতো।’

ঢাকার নবাবদের ঈদ

ঢাকার নবাবরা আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতেন। তাদের ঈদ উদযাপনের প্রধাণ আয়োজন শুরু হতো চাঁত দেখার মাধ্যমে। তখন ঢাকায় অত্যান্ত সমারোহের সঙ্গে ঈদের চাঁদ দেখা হতো। ঈদের দিন বড় পরিসরে ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হতো। নবাব পরিবারের ডায়েরি তেকে জানা যায়, ১৯০৬ সালে ঈদ হয়েছিল ১৮ নভেম্বর। সেদিন নবাব সলিমুল্লাহ মহল্লাবাসীদের নিয়ে দিলকুলা মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেদিন ঈদির জামাতে প্রায় ৫ হাজার লোক অংশ নিয়েছিল। এরপর আহসান মঞ্জিলে বিশাল মেহমানদারির আয়োজন করা হয়।

নবাবদের ওয়াকফ স্টেট নিয়ে বিরোধের কারণে নবাব সলিমুল্লাহর ছোট ভাই নওয়াবজাদা আতিকুল্লাহ আলাদা ভাবে ঈদের জামাত আয়োজন করেছিল। তার জামাতেও বিপুল লোক অংশগ্রহণ করেছিল। তিনিও নামাজের শেষে বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিলেন।

ইসলামের সূচনা থেকে ঈদ ছিল মুসলিম সংস্কৃতিও স্বাতন্ত্রবোধের অন্যতম নিদর্শন। যুগে যুগে মুসলিমরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই দিনটি উদযাপন করে এসেছে। বাংলা অঞ্চলেও দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ঈদ উদযাপনের রেওয়াজ ছিল। কালের পরিক্রমায়ায় যদিও ঈদকে শুধু মাত্র ধর্মীয় পরিসরে সীমিত করে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবু ’২৪-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ঈদের সেই পুরোনো দিনের আবহ ফিরে এসেছে। নতুন করে এখন আবার ঈদ মিছিল হচ্ছে। মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরাগত ঐতিহ্য মুসলিমবঙ্গে পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...