আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভাষার মাসের গুরুত্ব

জাহেদুল ইসলাম বাঁধন

ভাষার মাসের গুরুত্ব

‎ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময়, শোকময় এবং প্রেরণাদায়ক মাস। এই মাস এলে বাঙালির বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত আবেগ জেগে ওঠে। একদিকে গভীর শ্রদ্ধা ও শোক, অন্যদিকে অপরিসীম গর্ব ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতি। ফেব্রুয়ারি শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটি স্বাধীনতার প্রথম ধাপ, জাতীয় চেতনার উৎস এবং ভাষা-অধিকারের এক অমর দৃষ্টান্ত।

‎১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের ছিল দুটি অংশ। পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) এবং পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ভৌগোলিকভাবে হাজার মাইল দূরে। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী ছিল প্রায় ৫৬ ভাগ, যা পুরো পাকিস্তানের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। তবু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঘোষণা করেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণা পূর্ববাংলার মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

বিজ্ঞাপন

ভাষা আন্দোলনের সূচনা : ১৯৪৭ সালের শেষভাগ থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে প্রথম হরতাল পালিত হয়। ১৯৪৮ সালে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরা সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু আন্দোলনের চরম রূপ দেখা যায় ১৯৫২ সালে।

‎১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়। এর প্রতিবাদে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এর অর্থ, চারজনের বেশি একসঙ্গে জড়ো হওয়া যাবে না। কিন্তু বাঙালি ছাত্র-জনতা এই আইন মানেনি।

‎২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা জড়ো হন। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। পুলিশ প্রথমে লাঠিপেটা করে, তারপর গুলি চালায়। রক্ত ঝরে পড়ে রাজপথে। শহীদ হন আবুল বরকত (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র), আবদুস সালাম, আবদুল রফিক, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমানসহ অনেকে। আহত হন শতাধিক। পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি আরো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের স্মৃতিতে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে তোলা হয় (যা পরে সরকার ভেঙে দেয়)।
‎এই রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা পায় তার মর্যাদা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পূরণ করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু দুটোই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
‎একুশের এই আত্মত্যাগ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কানাডাপ্রবাসী রফিকুল ইসলাম, আব্দুস সালামসহ কয়েকজনের উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘে আবেদন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর ৩১তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশ এই দিন পালন করে ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। এটি বাঙালির জন্য অভূতপূর্ব গৌরব।

ফেব্রুয়ারির সাংস্কৃতিক প্রভাব : একুশের চেতনা শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক বিপ্লবও ঘটিয়েছে। এই আন্দোলন থেকে উদ্ভূত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, নাটক ও গল্প। কবি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, ‎আমি কি ভুলিতে পারি?’ ‎এই গান আজও বাঙালির বুকে আগুন জ্বালায়। একুশে বইমেলা, শহীদ মিনারে ফুঁ দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোÑএসব ফেব্রুয়ারির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বসন্তের আগমনের সঙ্গে ভাষার মাস মিলেমিশে একাকার।

‎ফেব্রুয়ারি আমাদের শেখায় ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের পরিচয়, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার প্রথম ধাপ। যে জাতি তার মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দিতে পারে, সে জাতি কখনো পরাজিত হয় না। একুশের চেতনা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথ দেখিয়েছে, আজও দেখাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন