আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্মৃতিকথা

আব্বুর সঙ্গে হিরণ পয়েন্ট

তারেক রহমান

আব্বুর সঙ্গে হিরণ পয়েন্ট

প্রতিটি সন্তানের কাছেই তার বাবা-মা গর্বের বিষয়। বিশেষ করে যদি সেই বাবা-মায়ের দেশের কল্যাণে অবদান থাকে এবং কোটি কোটি মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে। তাহলে সেই সন্তানের জীবন হয়ে ওঠে সার্থক। আমি সে রকম এক সৌভাগ্যবান সন্তান। আমার বাবা ছিলেন এ দেশের জননন্দিত প্রেসিডেন্ট। তাকে দিনের অধিকাংশ সময় রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো, সে জন্য আমি ও আমার ছোট ভাই বাবার সান্নিধ্য খুব কমই পেয়েছি। আমার বাবা যখন শহীদ হন, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু ঘটনা স্মৃতির ক্যানভাসে জ্বলজ্বল করে।

আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি, তখন কাকতালীয়ভাবে ক্লাসে নবম স্থান অধিকার করি। সে বছরই আব্বা-আম্মা নেপাল যাবেন রাষ্ট্রীয় সফরে। এর আগে নেপালের রাজা সপরিবারে বাংলাদেশ সফরে আসেন এরই পাল্টা সফরে আব্বা-আম্মা নেপাল সফরে যাচ্ছেন। নেপালের রাজার ছেলেকে আমি টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি। কারণ আব্বা আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন না। আব্বা-আম্মার সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমার মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এলো। রাজার ছেলে যদি বেড়াতে আসতে পারে, তবে আমরা কেন যেতে পারব না?

বিজ্ঞাপন

একদিন সন্ধ্যায় আব্বাকে কাছে পেয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বেশ জোরালো স্বরে বললাম, রাজার ছেলে রাজার সঙ্গে বেড়াতে আসতে পারে, তবে আমরা কেন তোমাদের সঙ্গে যেতে পারব না? সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করলাম আব্বা ঝট করে প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে বলে উঠলেন, তোমরা কোনো রাজার ছেলে নও। যাও পড়তে বসোগে।

এরপর আর আমার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না। কারণ এরপর দাঁড়িয়ে থাকলে উত্তম-মধ্যমের ব্যবস্থা হতো। পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম; কিন্তু দুঃখে আর কষ্টে পড়তে পারলাম না।

রাতে খাবার টেবিলে আম্মু বললেন, বিদেশ তো যেতে পারলে না, দেখি তোমার আব্বুকে বলে দেশের ভেতরে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাব। কি এবার খুশি তো?

আম্মুর কাছে বেড়ানোর আশ্বাস পেয়ে আমরা দুভাই মহাখুশি।

সম্ভবত ১৯৮১ সালের জানুয়ারির শেষদিকে। স্কুল খুলে গেছে। দুভাই স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, হঠাৎ আম্মু এসে বললেন, আজ স্কুলে যেতে হবে না। আমরা সবাই বেড়াতে যাব। তাড়াতাড়ি সুটকেস গুছিয়ে তৈরি হয়ে নাও। আমরা তো অবাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিলাম। দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম দুভাই। আব্বু-আম্মুও উঠলেন। বাড়ি থেকে সোজা এয়ারপোর্টে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে হেলিকপ্টারে উঠলাম। হেলিকপ্টার ঢাকা থেকে সোজা মোংলাবন্দরে এসে থামল। আব্বুর দিকে তাকিয়ে দেখি মুচকি মুচকি হাসছেন। তার কাছে ডেকে বললেন, চলো জাহাজে উঠি। তখন দেখলাম আমাদের সামনে চারতলা একটি সুন্দর জাহাজ দাঁড়িয়ে। আব্বুর সঙ্গে জাহাজে উঠলাম। জাহাজ ছাড়ল। কিছুক্ষণ পর আব্বু আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো পিনো, এই বন্দরটার নাম কী?

আমি কিছু চিন্তা না করেই জবাব দিলাম, কি জানি। আব্বু বললেন, লম্বা যত আহম্মক তত।

আমি বললাম কেন? আব্বা একটা নাম ফলকের দিকে দেখিয়ে বললেন, ওই দেখো কী নাম। তারপর আব্বু জাহাজের মধ্যেই সরকারি লোকজনের সঙ্গে ফাইলপত্র নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন। আর আমরা দুভাই চারতলায় আম্মুর কাছে গিয়ে বসলাম। সেদিন বিকালবেলা আমরা সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে পৌঁছালাম। জাহাজ থেকেই দেখলাম হরিণগুলো নদীর ধারে এসে পানি খাচ্ছে। আব্বু এসে কখন যে পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন, টেরই পাইনি। আব্বু পেছন থেকে বলে উঠলেন, কে কয়টা পর্যন্ত গুনতে পারবে? তাড়াতাড়ি দুভাই হরিণ গুনে খুব সম্ভব পাঁচ-ছটা পর্যন্ত গুনতে পারলাম। আব্বুও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গুনে পাঁচ-ছয়টাই হরিণ গুনতে পারলেন, তখন তিনি আমাদের বললেন, তোমাদের দৃষ্টিশক্তি তো খুব ভালো।

এই বলে নিচে নেমে গেলেন। হিরণ পয়েন্টের এক জায়গায় আব্বুর মিটিং ছিল, তিনি যাওয়ার পরই আমরা নিচে নেমে নদীর ধারে বেড়াতে গেলাম। সন্ধ্যায় আব্বু ফিরে এলেন। রাতে জাহাজের মধ্যে খাবার টেবিলে আমরা সবাই নানা রকম গল্প করলাম। বেশ রাত করে আমরা ঘুমাতে গেলাম। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জাহাজের জানালা দিয়ে দেখি পরিচিত দৃশ্য, তাড়াতাড়ি দুভাই মুখ ধুয়ে কাপড় পরে বের হয়ে দেখি আম্মু আমাদের ডাকতে আসছেন। আমাদের দেখে তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি এসো নাশতা শেষ করো। নাশতা শেষ করে দৌড়ে বাইরে এলাম, এসে দেখি আব্বু বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখে বললেন, বলো তো এই নদীর নাম কী? সঙ্গে সঙ্গে আমি বললামবুড়িগঙ্গা। আব্বু তখন বললেন, ‘মাথায় তাহলে কিছু আছে, সাব্বাস।’

জাহাজ এসে ঘাটে ভিড়ল, আমরা গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। বাসায় আসার পর আব্বু অফিসে চলে গেলেন, রাতে যখন অফিস থেকে ফিরলেন, তখনো আমরা জেগে। আমাকে ডেকে বললেন, খুশি তো? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

এই ছিলেন আমার আব্বু। তার ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল হৃদয়, আকাশের মতো উদার মন। বিশাল সরকারি দায়দায়িত্ব সত্ত্বেও সারা দিনে আমাদের সামান্য হলেও কিছু সময় দিতেন। আব্বুর অনেক স্মৃতি মনের পর্দায় গেঁথে আছে, আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিগুলোও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে মনে গেঁথে যাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন