দীর্ঘ সময় ধরে প্যাথলজি রিপোর্টে চিকিৎসকদের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা অনুমোদন দিত। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়ে কেবল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধিত চিকিৎসকেরা রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে পারবেন বলে নির্দেশনা জারি করেছে। অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা।
প্যাথলজি রিপোর্টে স্বাক্ষর প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টস (বিএসিবি)।
তারা বলেন, চিকিৎসকের একক স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হলে দেশে চলমান ল্যাবগুলোতে স্বাক্ষরকারীর তীব্র সংকট দেখা দেবে। এতে রিপোর্ট সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এছাড়া ডায়াগনস্টিক সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার ল্যাব অচল হয়ে পড়বে।
এ সময় অধিদপ্তরের নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাতিল এবং স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের আলোকে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা বলেন, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত প্রায় ২৬ হাজার প্যাথলজি ল্যাবের বড় একটি অংশের বায়োকেমিস্ট্রি ও ইমিউনোলজি বিভাগ নন-মেডিক্যাল ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের দক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। হঠাৎ করে শুধু বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দিয়ে রিপোর্ট স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করলে ল্যাবে রিপোর্ট স্বাক্ষরকারীর মারাত্মক সংকট তৈরি হবে, হাজার হাজার ল্যাব কার্যত অচল হয়ে পড়বে, রিপোর্ট ডেলিভারিতে মারাত্মক বিলম্ব হবে। অল্প সংখ্যক প্যাথলজিস্ট দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা অসম্ভব উল্লেখ করে তারা বলেন, এতে রোগীর জীবন-মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়বে এবং ডায়াগনস্টিক সেবার মান ও নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিএসিবির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক ও হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক উম্মেল খায়ের ফাতেমা খান মজলিসের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের আহ্বায়ক ও প্রভা হেলথের ল্যাব ডিরেক্টর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক কর্তৃক গত ৫ ও ৭ জানুয়ারি জারিকৃত প্যাথলজি ল্যাব সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনার ৫ নম্বর ইস্যুতে বলা হয়েছে, রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকগণকে বিএমডিসি রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্রাজুয়েট হতে হবে। এই নির্দেশনাটি বৈষম্যমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অযৌক্তিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ল্যাবরেটরি বাস্তবতার পরিপন্থী।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশেষায়িত ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরিগুলোতে হিস্টোপ্যাথোলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও ক্লিনিক্যাল প্যাথোলজিস্ট এবং মেডিকেল/ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা তাদের নিজ নিজ বিশেষজ্ঞ ক্ষেত্র অনুযায়ী পরীক্ষার রিপোর্টে স্বাক্ষর করে আসছেন। এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় চর্চা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত মানদণ্ড। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় চিকিৎসকদের পাশাপাশি বায়োকেমিস্ট ও ল্যাব বিশেষজ্ঞরা রিপোর্টে স্বাক্ষর করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল গ্রাজুয়েটদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু এ নির্দেশনার মাধ্যমে এসব দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীকে কার্যত অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও পেশাগত মর্যাদাহানিকর।
এ সময় ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যোগ্য ও অভিজ্ঞ ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রায় ৫০ বছর ধরে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টরা দেশের ডায়াগনস্টিক স্বাস্থ্য খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আধুনিক ল্যাবরেটরি সেবার বিকাশ, টেস্ট মেথড ভ্যালিডেশন, ইন্টারনাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল (আইকিউসি), এক্সটার্নাল কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট (ইকিউএএস), ক্যালিব্রেশন, এসওপি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অ্যাক্রেডিটেশনভিত্তিক কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে বলতে চাই যে, এই নির্দেশনার কারণে হাজারো ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টসহ অন্যান্য ল্যাবভিত্তিক বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী ডায়াগনোস্টিক সেক্টরে তাদের পরিশ্রম, দক্ষতা ও ন্যায্য পেশাগত ভূমিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি শুধু পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত নয়, বরং দেশের ডায়াগনস্টিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আবারও স্পষ্ট করে বলতে চাই, চিকিৎসকদের ল্যাবরেটরি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা আমরা করছি না। বরং চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট ও অন্যান্য ল্যাব পেশাজীবীদের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, কার্যকর, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ফ্যাসিস্ট সরকারের পরবর্তী সময়ে দেশে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল খাতে যে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তার ফলেই আজ দেশের জনগণ আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সেবা নিজ দেশেই পাচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে আমাদের বিদেশনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জারিকৃত এই নির্দেশনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, একটি সুপরিকল্পিত ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক চক্রান্তের অংশ। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের ডায়াগনোস্টিক সেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও পেশাদার ডায়াগনস্টিক ল্যাবভিত্তিক জনবল কার্যত ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।
এ সময় প্রধান অতিধি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন মোহাম্মদ শেখর বলেন, বিদ্যমান স্বাস্থ্য আইন বিশেষ করে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এবং এর সংশোধনীতে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের রিপোর্টে স্বাক্ষরের অধিকার বাতিল করে শুধু চিকিৎসকদের জন্য তা নির্ধারণ করার কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ সঠিক, নির্ভুল ও সময়োপযোগী রোগ নির্ণয় সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এছাড়া ভুল বা বিলম্বিত রোগ নির্ণয়ের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বাড়বে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বায়োকেমিস্ট্রি শিক্ষা নিরুৎসাহিত হবে। প্রায় ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং তরুণ মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারাবে। সেই সঙ্গে ডায়াগনস্টিক ল্যাবের মান ও দক্ষ জনবল দুর্বল হয়ে পড়বে, রোগীরা দেশের ডায়াগনস্টিক সেবার ওপর আস্থা হারাবে, উন্নত পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হবে। এ কারণে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে এবং চিকিৎসারর উদ্দেশ্যে অন্য দেশে ভ্রমণ বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসিবি পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে। এগুলো হলো—নির্দেশনার ৫ নম্বর ইস্যু অবিলম্বে বাতিল অথবা সংশোধন করতে হবে, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের (নন-মেডিক্যাল) রিপোর্ট স্বাক্ষরের অধিকার বহাল করতে হবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কম্পিটেন্সি বেইজড পলিসি প্রণয়ন করতে হবে, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাবনায় অ্যালাইড হেলথ কাউন্সিলের সাথে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টদের কাউন্সিল গঠন করতে হবে এবং পেশাগত বৈষম্য পরিহার করে রোগী নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যখাতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ, বিএসিবির কোষাধ্যক্ষ ও প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার, সমন্বয়কারী বাডাস ডক্টর আব্দুল মুত্তালেব, বিএসিবির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক ল্যাব ডিরেক্টর এনএইচএন শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

