আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হার্ট অ্যাটাক না হয়েও হৃদযন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন?

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ

হার্ট অ্যাটাক না হয়েও হৃদযন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন?

হৃদরোগ মানেই কি শুধু হার্ট অ্যাটাক বা রক্তনালিতে বড় ব্লক? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্তর এখন স্পষ্ট—না। হার্ট ফেইলিউর উইথ প্রিজার্ভড ইজেকশন ফ্র্যাকশন বা HFpEF এমনই এক হৃদরোগ, যেখানে হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা মোটামুটি ঠিক থাকলেও রোগী ধীরে ধীরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে HFpEF-কে মূলত হৃদযন্ত্রের শিথিল হওয়ার সমস্যা বা ডায়াস্টোলিক ডিসফাংশন হিসেবেই ধরা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এবং ২০২৫ সালে JACC : Advances-এ প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যালোচনা বলছে—HFpEF আসলে শুধু হৃদপেশির রোগ নয়। এর পেছনে রয়েছে হৃদযন্ত্রের ভেতরের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালির সমস্যা, যাকে বলা হয় করোনারি মাইক্রোভাসকুলার ডিজফাংশন (CMD)।

বিজ্ঞাপন

বড় রক্তনালি ঠিক থাকলেও সমস্যা কোথায়?

গবেষণায় দেখা গেছে, বড় করোনারি রক্তনালিতে কোনো ব্লক না থাকলেও প্রায় চারজন HFpEF রোগীর মধ্যে তিনজনেরই CMD রয়েছে। অর্থাৎ হার্টের বাইপাস বা এনজিওগ্রামে ধরা না পড়লেও সমস্যাটি ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে।

এই CMD মোটেও নিরীহ নয়। যাদের এ সমস্যা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে—

  • বারবার হার্ট ফেইলিউর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
  • মৃত্যুঝুঁকি ও বড় ধরনের হৃদযন্ত্রজনিত জটিলতা বেশি দেখা যায়।
  • দৈনন্দিন কাজকর্ম ও জীবনমান মারাত্মকভাবে কমে যায়।

CMD কীভাবে ক্ষতি করে?

CMD হলে হৃদযন্ত্রের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত সরবরাহ করতে পারে না। ফলে—

  • হৃদপেশির ভেতরের অংশে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়।
  • ছোট ছোট ক্ষতি জমতে জমতে হৃদপেশি শক্ত ও অনমনীয় হয়ে পড়ে।
  • হাঁটাচলা বা মানসিক চাপের সময় হৃদযন্ত্র বাড়তি কাজ করতে পারে না।
  • প্রদাহ ও রক্তনালির ক্ষতির একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।

এই অবস্থায় HFpEF এবং CMD একে অন্যকে আরো খারাপ করে তোলে—একটি আরেকটির জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন?

HFpEF নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এর একটি বড় কারণ CMD। নারীদের হৃদযন্ত্রের রক্তনালিগুলো আকারে ছোট হয় এবং মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় রক্তনালির স্বাভাবিক সুরক্ষা নষ্ট হয়। এতে প্রদাহ ও হৃদপেশি শক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণেই নারীদের ক্ষেত্রে HFpEF প্রায়ই বেশি জটিল আকার ধারণ করে।

রোগ নির্ণয়ে ঘাটতি

আধুনিক প্রযুক্তিতে CMD শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাস্তবে HFpEF রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা খুব কম করা হয়। কারণ এখনো পর্যন্ত HFpEF রোগীর জন্য CMD পরীক্ষা করার কোনো নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই। ফলে অনেক রোগীর সমস্যার মূল কারণ অজানাই থেকে যায়।

চিকিৎসা ও সীমাবদ্ধতা

বর্তমানে কিছু ওষুধ—যেমন SGLT2 ইনহিবিটর, স্ট্যাটিন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ওজন কমানো—HFpEF রোগীদের কিছুটা উপকার দেয় বলে প্রমাণ মিলছে। তবে সত্য কথা হলো, CMD-কে সরাসরি লক্ষ করে এমন নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো নেই।

শেষ কথা

সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। HFpEF আসলে একটি নীরব মাইক্রোভাসকুলার রোগ, যার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে হৃদযন্ত্রের অতিসূক্ষ্ম রক্তনালিতে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে HFpEF রোগীরাও চিকিৎসার আলো থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন