আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির চাহিদা

মাসুদুল ইসলাম

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির চাহিদা

২০২৫ সালে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৮৮৮ কোটি মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের জানুয়ারি ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বাজার ২০৩০ সাল নাগাদ ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। এই প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে আছে একটি সরল বাস্তবতা, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে ডিজিটাল উপস্থিতি ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে দেশের ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিগুলো।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাড়ছে

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেটারিপোর্টালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ৭৭ লাখে পৌঁছেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ছয় কোটিতে দাঁড়িয়েছে। দেশের জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তবে যে তথ্যটা সবচেয়ে কম আলোচিত হয়, সেটা হলো গ্রামীণ চিত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের জরিপ দেখাচ্ছে—গ্রামীণ এলাকায় ৭১ শতাংশ পরিবারের মোবাইল ফোনে প্রবেশাধিকার রয়েছে, অথচ শহরে এই হার মাত্র ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, ডিজিটাল ক্রেতা এখন আর শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামে নেই— তারা সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন। এই বিশাল নতুন বাজারটি ধরতে হলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অনলাইন উপস্থিতি থাকা এখন অপরিহার্য। জুম আইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিবলী মজুমদার এ প্রসঙ্গে জানান, ‘আমাদের কাছে এখন যেসব ক্লায়েন্ট আসছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই জেলা শহর ও মফস্বলের ব্যবসায়ী। তিন বছর আগেও এই ছবি ছিল না। গ্রামীণ ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তারাও বুঝতে পারছেন, ওয়েবসাইট ছাড়া তারা একটা বড় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছেন।’

অনলাইন বাণিজ্যের উত্থান

আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের সর্বশেষ প্রতিবেদন (জানুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনলাইন বাণিজ্য বাজার ২০২৯ সাল নাগাদ ৯৬৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান পেমেন্টস অ্যান্ড কমার্স মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে মাত্র তিনজনের মধ্যে একজন এখন অনলাইনে কেনাকাটা করেন। অর্থাৎ বাজারের বিশাল অংশ এখনো অধরা—এটাই আসল সুযোগ।

যে ঝুঁকির কথা বলা হয় না

দেশীয় বড় অনলাইন বাজার মঞ্চে বিক্রি করা সহজ, কিন্তু বিপজ্জনকও বটে। প্ল্যাটফর্মের নিয়ম বদলে গেলে, কমিশন বাড়লে বা অ্যাকাউন্ট স্থগিত হলে পুরো ব্যবসা থেমে যেতে পারে। নিজস্ব ওয়েবসাইটে সেই নির্ভরতা নেই—গ্রাহকের তথ্য, ব্র্যান্ডের পরিচয় এবং বিক্রির নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই ব্যবসায়ীর হাতে থাকে। এই উপলব্ধি থেকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এখন নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।

বড় প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন উদ্যোগ

মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে প্রযুক্তি সেবা বিভাগ ২০২৫ সালে রাজস্বের ৩২ দশমিক ৫৪ শতাংশ ধারণ করছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাত সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বার্ষিক ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ হারে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চাইছে এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স পরিকল্পনা ও গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার এবং তথ্য বিশ্লেষণ ড্যাশবোর্ড। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল সংযোগ এবং নিরাপত্তা সমাধান খুঁজছে। আর তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা আর্থিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতে ওয়েবভিত্তিক প্রাথমিক পণ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করছেন। জুম আইটির সেবা বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আবদুল হালিম এ বিষয়ে বলেন, ‘আগে ক্লায়েন্টরা শুধু একটা সুন্দর ওয়েবসাইট চাইতেন। এখন তারা জিজ্ঞেস করেন, এই ওয়েবসাইট থেকে আমি কত শতাংশ বেশি বিক্রি করতে পারব? চাহিদাটা পরিপক্ব হয়েছে। এটা শিল্পের জন্য ভালো সংকেত।’

সার্চ ইঞ্জিনে অদৃশ্য থাকার মূল্য কত

একটা পরিচিত দৃশ্য কল্পনা করুন, কেউ একটা নতুন রেস্তোরাঁ বা সেলুনের সন্ধান পেলেন বন্ধুর কাছ থেকে। প্রথমেই গুগলে খুঁজলেন। ওয়েবসাইট নেই, গুগল ম্যাপে তথ্য নেই। পরের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তিনি প্রতিযোগীর সাইটে চলে গেলেন। এই দৃশ্যটা এখন প্রতিদিন লক্ষবার ঘটছে বাংলাদেশে। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক দর্শক আনা, গুগলে বিজ্ঞাপন দেওয়া, ইমেইল মার্কেটিং, এর সবকিছুর কেন্দ্রে থাকে একটি কার্যকর ওয়েবসাইট। ফেসবুক পেজ সেই জায়গাটা পূরণ করতে পারে না, কারণ গুগল ফেসবুক পেজকে সরাসরি র‍্যাংক করে না। আর একটি পেশাদার ওয়েবসাইট ২৪ ঘণ্টা, সাত দিন ক্রেতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, কোনো কর্মী ছাড়াই।

সীমাবদ্ধতার সৎ মূল্যায়ন

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশে ৪ হাজার ৫০০টিরও বেশি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত পেশাদারের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি ৭২ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। তবে একটা সতর্কবার্তা এখানে না দিলে চিত্র অসম্পূর্ণ থাকবে। সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের ফ্রিল্যান্সিং র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২৯তম। সংখ্যায় পেশাদার অনেক, কিন্তু প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় প্রতি ঘণ্টার আয় কম। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি, সেই লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে।

সমস্যাটা দক্ষতার ঘাটতি। মর্ডর ইন্টেলিজেন্স জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ হাজার সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না বাড়ালে এই ব্যবধান আরো বাড়বে। এই চ্যালেঞ্জটি স্বীকার করেই জুম আইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, শুধু ওয়েবসাইট তৈরি নয়, ক্লায়েন্টের ব্যবসার ডিজিটাল কৌশল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা করছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...