ভিটামিন ডি হলো চর্বিতে দ্রবণীয় একগুচ্ছ সেকোস্টেরয়েড। মানবদেহে এর দুটি প্রধান রূপ কার্যকর। ভিটামিন ডি২ এবং ডি৩ । ডি২ মূলত উদ্ভিদজাত উৎস থেকে আসে। ভিটামিন ডি৩ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির (UVB) প্রভাবে আমাদের ত্বকে সংশ্লেষিত হয় এবং প্রাণিজ উৎস থেকে পাওয়া যায়।
শরীরের অভ্যন্তরে এর রূপান্তর প্রক্রিয়া
আমরা সূর্য বা খাবার থেকে যে ভিটামিন ডি পাই, তা সরাসরি কাজ করতে পারে না। এটি যকৃতে (Liver) গিয়ে ‘calcidiol’ এবং পরে কিডনিতে গিয়ে ‘calcitriol’ বা সক্রিয় ভিটামিন ডি’তে রূপান্তরিত হয়। এই সক্রিয় রূপটিই শরীরের কোষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।
মানবদেহে ভিটামিন ডি’র বহুমুখী কাজ
* হাড় ও কঙ্কালতন্ত্রের সুরক্ষা। ভিটামিন ডি’র প্রধান কাজ হলো অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস শোষণে সহায়তা করা। এই উপাদানগুলো ছাড়া হাড়ের খনিজকরণ (Mineralization) সম্ভব নয়।
- শিশুদের ক্ষেত্রে : অভাব হলে ‘রিকেটস’ হয়, যার ফলে হাড় নরম ও বাঁকা হয়ে যায়।
- বড়দের ক্ষেত্রে : ‘অস্টিওম্যালাসিয়া’ বা হাড়ের ব্যথা এবং ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম। ভিটামিন ডি আমাদের শ্বেত রক্তকণিকাকে (T-cells এবং Macrophages) সক্রিয় করে। এটি অটো-ইমিউন রোগ, যেমন টাইপ ১ ডায়াবেটিস, মাল্টিপল স্কলেরোসিস এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক গবেষণায় কোভিড ১৯-সহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের তীব্রতা কমাতে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
* পেশির কার্যকারিতা ও ভারসাম্য। পেশির শক্তি বৃদ্ধিতে ভিটামিন ডি সরাসরি কোষের রিসেপ্টরের মাধ্যমে কাজ করে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড় ভাঙার অন্যতম কারণ হলো ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পেশির সমন্বয় বাড়িয়ে এই ঝুঁকি কমায়।
* মানসিক স্বাস্থ্য ও বিষণ্ণতা। মস্তিষ্কের যে অংশগুলো মেজাজ বা ‘মুড’ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে ভিটামিন ডি রিসেপ্টর থাকে। শীতকালীন বিষণ্ণতা (Seasonal Affective Disorder) এবং সাধারণ ডিপ্রেশন কাটাতে সূর্যের আলোর ভূমিকা অপরিসীম।
* হৃদরোগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ। এটি রক্তনালির প্রদাহ কমায় এবং রেনিন-অ্যানজিওটেনসিন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
* দাঁত শক্ত হয়। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট শিশু ও বয়স্কদের দাঁতের ক্ষয়রোধ করে । এটি দাঁতের মিনারেলের উন্নতি ঘটায় এবং দাঁতের ক্ষয় রোধ করে।
* অত্যধিক ক্লান্তি। পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে শরীর সারাক্ষণ ক্লান্ত ও দুর্বল মনে হওয়া।
* মাত্রাতিরিক্ত চুল পড়াও ভিটামিন ডি’র ঘাটতির একটি লক্ষণ হতে পারে।
* ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া। ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে শরীরে কোনো আঘাত বা অস্ত্রোপচারের ক্ষত শুকাতে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি সময় লাগে।
১০. ওজন কমাতে সাহায্য করে । ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, ফলে ওজন কমানো সহজ হয়। এছাড়া এটি কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করে, যা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখে।
ভিটামিন ডি’র অভাবের কারণ
ভিটামিন ডি’র অভাব কেবল ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। নিচে এর প্রধান তিনটি কারণ বিশ্লেষণ করা হলো—
ক. ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত বিশ্লেষণ
* অক্ষাংশ (Latitude) : নিরক্ষরেখা থেকে যত উত্তর বা দক্ষিণে যাওয়া যায়, সূর্যের রশ্মি ততটাই তির্যকভাবে পৃথিবীতে পড়ে। ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর অতিবেগুনি রশ্মি (UVB) শোষণ করে নেয় এবং ত্বক পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে না।
* ঋতু পরিবর্তন : শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হয় এবং মানুষ বেশি কাপড় পরে থাকে। এছাড়া মেঘলা আকাশ বা কুয়াশার কারণেও UVB রশ্মি বাধাগ্রস্ত হয়।
* বায়ুদূষণ : শিল্পোন্নত এলাকা বা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে (যেমন ঢাকা বা দিল্লি) বায়ুর কণা এবং ধোঁয়াশা সূর্যের আলোকে ফিল্টার করে দেয়, যার ফলে ত্বকে প্রয়োজনীয় রশ্মি পৌঁছাতে পারে না।
খ. সামাজিক ও জীবনযাত্রার বিশ্লেষণ
* গৃহবন্দি জীবন : আধুনিক নগরায়ণে মানুষ দিনের বেশিরভাগ সময় অফিস, বাসা বা শপিং মলে কাটায়। শিশুদের খেলার মাঠের অভাব এবং অনলাইন গেমের আসক্তি তাদের সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত করছে।
* পোশাক ও সংস্কৃতি : ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে শরীর ঢেকে রাখার পোশাক পরলে ত্বকের সংস্পর্শে আলো আসার সুযোগ কমে যায়।
* সানস্ক্রিনের ব্যবহার : SPF 30 বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা প্রায় ৯৫-৯৮ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
* খাদ্য নিরাপত্তা ও অভ্যাস : উন্নয়নশীল দেশে পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং উন্নত বিশ্বে প্রসেসড ফুডের আধিক্য—উভয়ই ভিটামিন ডি’র পর্যাপ্ত উৎস থেকে মানুষকে দূরে রাখে।
গ. জৈবিক ও জিনগত বিশ্লেষণ
* ত্বকের রঙ : মেলানিন একটি প্রাকৃতিক সানব্লক। যাদের ত্বকের রঙ গাঢ়, তাদের শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির জন্য ফর্সা মানুষের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি সময় রোদে থাকা প্রয়োজন।
* স্থূলতা (Obesity) : ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয়। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ভিটামিন ডি’কে রক্তের প্রবাহে মিশতে না দিয়ে চর্বিকোষে আটকে রাখে (Sequestration)।
* বয়স : বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল (7-dehydrocholesterol) নামক উপাদানটি কমে যায়, যা ভিটামিন ডি তৈরির প্রধান কাঁচামাল।
* জিনগত মিউটেশন : কারো কারো শরীরে ‘Vitamin D Receptor’ (VDR) জিনে ত্রুটি থাকে, ফলে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকা সত্ত্বেও শরীর তা গ্রহণ করতে পারে না।
লেখক : শিক্ষার্থী, খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

