গ্রামবাসী না গেলে লাশ ভেসে যেত সাগরে

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে মৃত্যুর পরও লাশ নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে মৃত্যুর পরও লাশ নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ড। ছবি: আমার দেশ

জীবিকার তাগিদে কর্মস্থলে গিয়েছিলেন তারা। ঘরে অপেক্ষায় ছিল সন্তান, স্ত্রী কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবা। কিন্তু ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই নয়টি পরিবারে নামিয়ে আনে শোকের অন্ধকার। প্রিয়জন হারানোর সেই শোকের মধ্যেই নিহত শ্রমিকদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে স্বজনদের অভিযোগে তৈরি হয়েছে নতুন ক্ষোভ ও প্রশ্ন। তাদের দাবি, দুর্ঘটনার পর কয়েকজন শ্রমিকের লাশ জাহাজের ডেক, ইয়ার্ডসংলগ্ন পানি এবং জাহাজের পেছনে লোহার প্লেটের নিচে পড়ে ছিল। স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার না করলে পানিতে থাকা লাশগুলো জোয়ারের স্রোতে সাগরের দিকে ভেসে যেতে পারত।

নিহতদের অধিকাংশের বাড়ি শিপইয়ার্ডসংলগ্ন গ্রামগুলোতে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজন ও স্থানীয়রা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল গনিসহ কয়েকজন গ্রামবাসী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাশ উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। প্রিয়জন হারানোর আহাজারির মধ্যেই লোহার প্লেট ও পানির ভেতর লাশ খুঁজে বের করার সেই দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি করে গভীর ক্ষোভ ও বেদনা।

বিজ্ঞাপন

নিহত এক শ্রমিকের মেয়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মৃত্যুর পরও লাশ নিয়ে লুকোচুরি! জাহাজের পেছনে প্লেটের নিচে পড়ে ছিল আমার বাবা ও বড় আব্বুর লাশ। তার এই আর্তনাদ যেন দুর্ঘটনার পর স্বজনদের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। তাদের প্রশ্ন, দুর্ঘটনার পর লাশ দ্রুত উদ্ধার করা হলো না কেন? জাহাজের প্লেটের নিচে কিংবা পানিতে লাশ কীভাবে গেল? উদ্ধার কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোথায় ছিলেন? স্থানীয়দের কেন নিজেদের উদ্যোগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাশ উদ্ধার করতে হলো?

স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র আড়াল কিংবা লাশ সরিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কিনা, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর নিহতের সংখ্যা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। শিপইয়ার্ডের মালিক ওয়াহিদ মাসুদ প্রাথমিকভাবে তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেলেও পরবর্তীতে নয়জন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে। তথ্যের এই অসামঞ্জস্যে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাদের দাবি, পুলিশ, প্রশাসন, হাসপাতাল ও শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের তথ্য মিলিয়ে নিহত, আহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হোক।

দুর্ঘটনার দিন শুক্রবার শ্রমিকদের কাজে আনা হয়েছিল কিনা, কার অনুমতিতে কাজ চলছিল, জাহাজে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কিনা, এসব প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে গ্যাস, ভারী ধাতু ও জাহাজের কাঠামোগত ঝুঁকি থাকায় কাজ শুরুর আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্যাস পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা, তা নিরপেক্ষ তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তবে লাশ গুম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, স্বজনদের এমন অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, লাশ উদ্ধারে অংশ নেওয়া গ্রামবাসীদের সাক্ষ্য এবং দুর্ঘটনার সময়কার নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।

নিহতদের স্বজনদের কাছে প্রতিটি লাশ শুধু একটি দেহ নয়, একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং অসংখ্য স্বপ্নের সমাপ্তি। কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের ভরসা, আবার কেউ ছিলেন বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ আশ্রয়। কর্মস্থলে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরার পর তাদের পরিবারকে এখন শোকের পাশাপাশি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে।

১৪ আগস্টের এই প্রাণহানি তাই শুধু নয়টি পরিবারের কান্নার ঘটনা নয়, এটি সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধারব্যবস্থা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। স্বজনদের দাবি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিহতের সঠিক সংখ্যা এবং মৃত্যুর পর লাশ উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য প্রকাশ ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। জীবিকার জন্য মানুষ কাজে যায়, জীবনের বিনিময়ে নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...