মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক জীব। আর এই সমাজবদ্ধ জীবনের ধারাবাহিকতায় জীবন তাকে প্রতিনিয়ত নানামুখী কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে রাখে। কেউ নিয়োজিত থাকে চাকরির কাঠামোবদ্ধ শৃঙ্খলে, কেউ শ্রমনির্ভর কঠোর পরিশ্রমে, কেউ কৃষিভিত্তিক জীবিকায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করে, আবার কেউ ঝুঁকে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃত অঙ্গনে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবসার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে; কারণ সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসা মানুষকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আর্থিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা এনে দিতে পারে। তবে শুধু ব্যবসা নয়, জীবনের প্রতিটি স্তরে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করাই একজন বিচক্ষণ ও সচেতন মানুষের পরিচয়। কেননা জীবন নিজেই এক অবিরাম সংগ্রামের নাম, যেখানে চলার পথে মানুষকে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়; লেনদেন, ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম, বৃহৎ ব্যবসায়িক হিসাবনিকাশ এবং অনলাইনভিত্তিক নানা ডিজিটাল কার্যক্রমের মতো জটিল ও সংবেদনশীল কাজের মুখোমুখি হতে হয়। এসব কর্মকাণ্ডকে আরো সহজ, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আধুনিক যুগে যে প্রযুক্তি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম, তা হলো ব্লকচেইন প্রযুক্তি। ব্লকচেইন এমন একটি উন্নত ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে জমির দলিলসহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেখানে তথ্যবিকৃতি বা হ্যাক করে আত্মসাৎ করার আশঙ্কা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, সেখানে এই প্রযুক্তি হতে পারে মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক।
মূলত ব্লকচেইন হলো বহুসংখ্যক ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো, যেখানে প্রতিটি ব্লক নির্দিষ্ট তথ্য ধারণ করে এবং এই পুরো ব্যবস্থা একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার হিসেবে কাজ করে, যা একদিকে সবার জন্য উন্মুক্ত, অন্যদিকে একবার সংরক্ষিত তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ব্লকচেইনের প্রতিটি ব্লকের ভেতরে থাকে তিনটি মৌলিক উপাদান—সংরক্ষিত ডেটা, সেই ডেটার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া একটি অনন্য হ্যাশ এবং তার পূর্ববর্তী ব্লকের হ্যাশ, যার ফলে প্রতিটি ব্লক পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে।
হ্যাশ মূলত একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী সংকেত, যা মানুষের আঙুলের ছাপের মতোই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ও অননুকরণীয়। একটি ব্লকের ডেটায় সামান্যতম পরিবর্তন ঘটলেই তার হ্যাশ সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, ফলে পুরো চেইনের কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণেই ব্লকচেইনে ইচ্ছামতো তথ্য পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্লকসহ তার আগের সব ব্লকের তথ্য একসঙ্গে পরিবর্তন করতে হয়, যা বাস্তবিক অর্থে প্রায় অসম্ভব। যদিও ব্লকচেইনকে অনেকেই আধুনিক যুগের প্রযুক্তি বলে মনে করেন, বাস্তবে এর ধারণার জন্ম ১৯৯১ সালে, যখন স্টুয়ার্ট হ্যাবার এবং ডব্লিউ স্কট স্টর্নেটা ডিজিটাল ডকুমেন্টে টাইমস্ট্যাম্প সংযুক্ত করে তথ্যের অখণ্ডতা রক্ষার একটি কৌশল ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে বিটকয়েন আবিষ্কারের মাধ্যমে ব্লকচেইন প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; কারণ ব্লকচেইন ছাড়া বিটকয়েন বা অন্য কোনো ক্রিপ্টো-মুদ্রার লেনদেন কার্যত অসম্ভব। ব্লকচেইন মূলত হ্যাশ ফাংশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে যেকোনো আকারের তথ্যকে সমান দৈর্ঘ্যের একটি সংকেতে রূপান্তর করা হয়। বিটকয়েন নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত SHA-256 হ্যাশ ফাংশন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি উদ্ভাবন করেছে। এটি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত।
ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে যখনই কোনো ট্রানজেকশন সম্পন্ন হয়, সেই তথ্য সেই মুহূর্তে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা হাজার হাজার কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিটি নতুন ট্রানজেকশন আগের ট্রানজেকশনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটানা শৃঙ্খল তৈরি করে। ফলে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা গরমিল সৃষ্টি করতে হলে একজন হ্যাকারকে একই সময়ে অসংখ্য কম্পিউটার হ্যাক করতে হবে, যা বাস্তব জীবনে প্রায় অসম্ভব। গড়ে একটি ব্লক তৈরি হতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগে, আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বিশাল নেটওয়ার্কে আক্রমণ চালানো কেবল কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। এ কারণেই বলা যায়, ব্লকচেইন প্রযুক্তি একদিকে যেমন দ্রুতগতির, অন্যদিকে তেমনি অত্যন্ত নিরাপদ। এর ফলে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিশ্বের বহু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, কিংবা পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার শুরু করেছে। কারণ মানুষ যে পেশাতেই নিয়োজিত থাকুক না কেন অর্থ ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উপার্জনের প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি কখনোই অর্জিত হয় না। এই সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

