চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দান মানুষের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। অতীতে যেসব অসুখকে নিশ্চিত মৃত্যু মনে করা হতো, এখন সেসব রোগের কার্যকর প্রতিষেধক ও চিকিৎসাপদ্ধতি বের হয়েছে। এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, লেজার অপারেশন, কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী বদল এনেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে রোগ নির্ণয় এখন অনেক বেশি নির্ভুল ও দ্রুত হয়েছে। টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও উন্নত চিকিৎসকের পরামর্শ পাচ্ছেন। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া এবং মৃত্যুহার কমে যাওয়ার পেছনেও চিকিৎসা প্রযুক্তির অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার জগতেও প্রযুক্তি এনেছে অভাবনীয় রূপান্তর। একসময় পড়াশোনা শুধু নির্দিষ্ট ও সুবিধাভোগী কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
আজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞান অর্জনের পথ সবার জন্য উন্মুক্ত। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরি এবং স্মার্ট ক্লাসরুম পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও ফলপ্রসূ করেছে। একজন শিক্ষার্থী এখন নিজের ঘরে বসেই পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার শুনতে পারে। প্রযুক্তি পড়াশোনাকে সহজ, আকর্ষণীয় এবং সর্বজনীন করে তুলেছে। চাষাবাদের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষিনির্ভর দেশগুলোয় আধুনিক চাষের যন্ত্রপাতি, উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আধুনিক সেচব্যবস্থার ফলে ফসলের উৎপাদন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে চাষিরা এখন আগেভাগেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে পারছেন এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ করে বেশি ফলন ঘরে তুলছেন। খাদ্যসংকট দূর করতে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান আধুনিক সমাজের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কলকারখানায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও রোবট ব্যবহার করার ফলে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের শারীরিক খাটুনি কমেছে। প্রযুক্তির কারণে শিল্পকারখানার কাজ দ্রুত, নিখুঁত এবং কম খরচে করা সম্ভব হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স ও ডিজিটাল লেনদেন পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের এগিয়ে যাওয়ার গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্রুতগতির ট্রেন, মেট্রোরেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিমান এবং বড় বড় সমুদ্রযান মানুষের যাতায়াতকে করেছে সহজ ও সময়সাশ্রয়ী। আধুনিক প্রযুক্তির ফলে মানুষ খুব অল্প সময়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করতে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানের আদান-প্রদান আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাকাশ গবেষণায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্য মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে, মঙ্গল গ্রহে মহাকাশযান পাঠিয়েছে এবং মহাবিশ্বের অজস্র অজানা রহস্য উন্মোচনের জন্য দিনরাত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেলিযোগাযোগ, জিপিএস গাইড এবং সামরিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। মহাকাশ প্রযুক্তি বর্তমান সভ্যতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উন্নতির পাশাপাশি এর অপব্যবহারও মানুষের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বোমা, রাসায়নিক অস্ত্র, জীবাণু অস্ত্র এবং সাইবার অপরাধ আধুনিক বিশ্বের জন্য একটি গভীর চিন্তার বিষয়। প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুল ব্যবহার, তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং প্রযুক্তি আসক্তি মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের ভেতরের মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই প্রযুক্তির সঠিক এবং নীতিগত ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাঠে বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া সবখানে পৌঁছে গেছে। ই-গভর্নেন্স, অনলাইন পড়াশোনা, মোবাইল ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং এবং আইটিভিত্তিক কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশা জাগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আকাশে পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ মহাকাশ প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। দেশের তরুণ সমাজ এখন প্রযুক্তিনির্ভর নতুন নতুন আবিষ্কার ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগামীর পৃথিবী হবে আরো অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা AI রোবোটিকস, জিন প্রকৌশল, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং স্মার্ট সিটি প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার ধরন পুরোপুরি বদলে দেবে। মানুষ হয়তো ভবিষ্যতে এমন একসময়ে পৌঁছাবে, যেখানে বেশির ভাগ কাজই সম্পন্ন হবে যন্ত্রের মাধ্যমে। কিন্তু প্রযুক্তির এই রাজকীয় অগ্রযাত্রার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং সামাজিক সামঞ্জস্য ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে প্রযুক্তি মানুষের মঙ্গলের বদলে মানবজাতির জন্য বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মূলত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এক অতুলনীয় বাহন। তাই প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করার জন্য আমাদের দেশে সুব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি এবং এর মূল্যায়ন করা এবং মেধাবীদের সাপোর্ট করে উৎসাহ দিয়ে দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

