মহাকাশের বিশালতার মধ্যে প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে নানা রকম বিস্ময়কর ঘটনা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত এক বিশাল প্লাজমা মেঘ, যার ভর প্রায় ১০০ কোটি টন। খবরটি প্রকাশের পর অনেকের মনে উদ্বেগ দেখা দিলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে সূর্যের এই ভিন্ন বিস্ময়কর রূপ দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছে পুরো বিশ্ব। সূর্যের বুকে ঘটে যাওয়া এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের কারণে প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) টন ওজনের আয়নিত কণা বা চৌম্বকীয় প্লাজমার একটি বিশাল মেঘ ধেয়ে এসেছে পৃথিবীর দিকে। গত ৮ জুন এই মহাজাগতিক মেঘটি আঘাত হেনেছে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি তীব্র গতিতে ছুটে আসা এই প্লাজমা মেঘকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘করোনাল মাস ইজেকশন’ (CME)। আমেরিকার স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের (NOAA) বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি শক্তিশালী ‘ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়’ (Geomagnetic Storm) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব ঠিক কতটা, সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজব। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। এটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও আয়নিত গ্যাস, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সক্ষম। সূর্য থেকে নির্গত এই প্লাজমা মেঘ যখন পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন তা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি করে।
প্রযুক্তিতে প্রভাব
সাধারণ মানুষের শরীরের ওপর সরাসরি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকলেও, বিজ্ঞানীদের তৈরি আধুনিক প্রযুক্তি-কাঠামোর ওপর এটি বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। যেমনÑ
স্যাটেলাইট ও জিপিএস বিপর্যয়
মহাকাশে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলো এই প্লাজমা মেঘের তীব্র চার্জযুক্ত কণার সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে জিপিএস (GPS) এবং নেভিগেশন সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিতে পারে, যা বিমান ও সমুদ্রগামী জাহাজের পথ চলায় বিঘ্ন ঘটায়।
ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা
প্লাজমা মেঘের শক্তিশালী চৌম্বকীয় তরঙ্গ যখন পৃথিবীর মাটিতে আঘাত করে, তখন বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ বা ‘জিওম্যাগনেটিক্যালি ইন্ডিউসড কারেন্ট’ তৈরি হয়। এর ফলে বড় বড় ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে।
রেডিও ব্ল্যাকআউট
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার স্তরটি ওলটপালট হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ-কম্পাঙ্কের (HF) রেডিও যোগাযোগ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
মহাকাশচারীদের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) থাকা মহাকাশচারীরা এ সময় তীব্র মহাজাগতিক বিকিরণ বা রেডিয়েশনের ঝুঁকিতে পড়েন। এই প্লাজমা মেঘ শুধু ক্ষতিই করে না, এর রয়েছে চোখ জুড়ানো কিছু বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ
আকাশে আলোর নৃত্য
এই ঝড়ের সবচেয়ে সুন্দর উপহার হলো মেরুজ্যোতি বা অরোরা (Aurora)। সূর্যের চার্জিত কণাগুলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন মেরু অঞ্চলের আকাশে সবুজ, বেগুনি ও লাল আলোর এক অপূর্ব ক্যানভাস তৈরি হয়। এবার এই ঝড় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সাধারণত যেসব অঞ্চলে অরোরা দেখা যায় না (যেমন : হিমালয় অঞ্চল), সেখানেও আকাশের উত্তর দিগন্তে হালকা রঙিন আভা দেখা গেছে।
মহাকাশের আবর্জনা পরিষ্কার
এই ঝড়ের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগ কিছুটা প্রসারিত হয়। এর ফলে নিম্ন কক্ষপথে জমে থাকা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বা ‘স্পেস জাঙ্ক’ বাতাসের ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে নিচে নেমে আসে।
এ ধরনের ঘটনা বিজ্ঞানীদের মহাকাশের আবহাওয়া বুঝতে এবং ভবিষ্যতের আরো শক্তিশালী সৌরঝড় থেকে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পাওয়ার গ্রিডকে সুরক্ষিত রাখার প্রযুক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। সূর্যের এই কোটি কোটি টনের মারাত্মক রেডিয়েশনকে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র একটি অদৃশ্য জালের মতো আটকে দিয়ে আমাদের রক্ষা করছে। প্রযুক্তির সাময়িক কিছু ত্রুটি বাদ দিলে, প্রকৃতি যেমন ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তেমনি অরোরার মতো অদ্ভুত সুন্দর কোনো সৃষ্টিও এ ঘটনায় পাওয়া যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

