এক গ্যালাক্সিতে বিশালাকার তিন কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান

এক গ্যালাক্সিতে বিশালাকার তিন কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান
ছবি: পিএইচওয়াইএস.ওআরজি

একটি গ্যালাক্সিতে একই সঙ্গে তিনটি সক্রিয় বিশালাকার কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি দূরের গ্যালাক্সি জি০১৪৮-৪২১৪-এ এসব কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান মিলেছে। আন্তর্জাতিক একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী এই গবেষণা করেছেন। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিকস।

গবেষকেরা বলছেন, দূরবর্তী মহাবিশ্বের একটি গ্যালাক্সিতে একই সঙ্গে তিনটি সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর থাকার এটিই প্রথম প্রমাণ। আবিষ্কারটি মহাবিশ্বের শুরুর দিকে গ্যালাক্সি ও কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে গড়ে উঠেছিল এবং দ্রুত বড় হয়েছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

গ্যালাক্সিটি এত দূরে যে সেখান থেকে আসা আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর সময় লেগেছে। ফলে এখন গ্যালাক্সিটিকে যে অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, সেটি মহাবিস্ফোরণের মাত্র প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন বছর পরের চিত্র।

গবেষণার প্রধান লেখক ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিকসের গবেষণা দলের প্রধান হান্না উবলার বলেন, ‘দূরবর্তী মহাবিশ্বের একটি গ্যালাক্সিতে তিনটি সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর থাকার এটিই প্রথম প্রমাণ।’

গবেষণাটি অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

একই গ্যালাক্সিতে তিন কৃষ্ণগহ্বর

তিনটি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে দুটি রয়েছে গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে। পর্যবেক্ষণে তাদের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৬২০ আলোকবর্ষ। তৃতীয়টি রয়েছে গ্যালাক্সির বাইরের অংশে। কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৫০০ আলোকবর্ষ।

তিনটি কৃষ্ণগহ্বরই সক্রিয়। তাদের চারপাশের অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে পদার্থ ক্রমাগত কৃষ্ণগহ্বরের দিকে পড়ে। এই পদার্থ গ্রহণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কৃষ্ণগহ্বরগুলো সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, মহাবিশ্বের শুরুর দিকে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের খুব কাছে চলে আসত। পরে সেগুলো একীভূত হতো। এ সময় গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরও পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসতে পারত। শেষ পর্যন্ত সেগুলো একীভূত হয়ে আরো বড় কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করত।

হান্না উবলার বলেন, গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা করা যায়, মহাবিশ্বের শুরুর দিকে বড় ভরের কৃষ্ণগহ্বরগুলোকে দ্রুত একে অপরের কাছে নিয়ে আসার মতো কার্যকর প্রক্রিয়া ছিল। ভবিষ্যতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোতে যে বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের একীভবন শনাক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়া তার ভিত্তি তৈরি করে থাকতে পারে।

কীভাবে সন্ধান মিলল

কৃষ্ণগহ্বরগুলোকে সরাসরি দেখা যায় না। গবেষকেরা তাদের শনাক্ত করেছেন বর্ণালিতে থাকা বিশেষ সংকেত বিশ্লেষণ করে। কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে উচ্চগতিতে চলা হাইড্রোজেন পরমাণুর সংকেত থেকে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বর্ণালিতে একটি জটিল কাঠামো দেখা যায়। এই কাঠামোর সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে গবেষকেরা কাছাকাছি থাকা দুটি কৃষ্ণগহ্বরকে চিহ্নিত করেন।

তবে দুটি কৃষ্ণগহ্বরকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা সহজ ছিল না। এ জন্য গবেষকেরা স্পেকট্রো-অ্যাস্ট্রোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে গ্যালাক্সির বিভিন্ন অংশে নির্গমন রেখার স্থানিক পরিবর্তন নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায়। এর ফলে আলাদাভাবে বিন্দু উৎস হিসেবে দেখা না গেলেও দুটি কৃষ্ণগহ্বরের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

এরপর গ্যালাক্সিটির বাইরের অংশে তৃতীয় কৃষ্ণগহ্বরটির সন্ধান পাওয়া যায়।

তিন কৃষ্ণগহ্বরের ভর

গবেষণায় তিনটি কৃষ্ণগহ্বরের ভরও হিসাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়টির ভর প্রায় ৮ কোটি সূর্যের সমান। অন্য দুটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর প্রায় ৬ লাখ এবং ২০ লাখ সূর্যের সমান।

সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরটি কাছের ৬ লাখ সূর্যভরের কৃষ্ণগহ্বরটির তুলনায় কম হারে পদার্থ গ্রহণ করছে। বিপরীতে ৬ লাখ সূর্যভরের কৃষ্ণগহ্বরটি সক্রিয়ভাবে পদার্থ গ্রহণ করছে। এর পদার্থ গ্রহণের হার কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধির মৌলিক তত্ত্বে নির্ধারিত সর্বোচ্চ হার, অর্থাৎ এডিংটন সীমারও বেশি।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (জেডব্লিউএসটি) তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর ও পদার্থ গ্রহণের হার হিসাব করেছেন। একই তথ্য থেকে গ্যালাক্সিটির নক্ষত্রের মোট ভরও নির্ণয় করা হয়েছে।

গবেষণার দ্বিতীয় লেখক ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিকসের গবেষক জিওভান্নি মাজ্জোলারি বলেন, গ্যালাক্সিটির নক্ষত্রের মোট ভর প্রায় ১৩০ কোটি সূর্যের সমান। কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর গ্যালাক্সিটির মোট নক্ষত্রের ভরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।

দুটি কৃষ্ণগহ্বর একীভূত হতে পারে

গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে থাকা দুটি কৃষ্ণগহ্বর আগামী কয়েক শ মিলিয়ন বছরের মধ্যে একীভূত হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।

গবেষণার সহলেখক ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্তো মাইওলিনো বলেন, এই ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, মহাবিশ্বের শুরুর দিকে কৃষ্ণগহ্বরের দ্রুত বৃদ্ধির একটি দ্রুততর পথ হতে পারে তাদের একে অপরের সঙ্গে একীভূত হওয়া।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রের বাইরে থাকা তৃতীয় কৃষ্ণগহ্বরটির অবস্থান নিয়েও কয়েকটি সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। এটি আগের কোনো একীভবনের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। আবার মহাকর্ষীয় প্রতিঘাতের কারণে এটি গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গিয়ে থাকতে পারে। অথবা এটি বর্তমানে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসতে পারে।

দূরত্ব ও রেডশিফট

গ্যালাক্সিটির রেডশিফটের মান পাওয়া গেছে ৫ দশমিক ০২। মহাকাশের প্রসারণের কারণে দূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাই রেডশিফট নামে পরিচিত।

গবেষকেরা রেডশিফটের এই মান ব্যবহার করে গ্যালাক্সিটির দূরত্ব হিসাব করেছেন। হিসাব অনুযায়ী, গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি দূরে।

এ কারণে গবেষকেরা মূলত মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়ের একটি চিত্র দেখতে পাচ্ছেন। তখন মহাবিস্ফোরণের পর মাত্র প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন বছর পেরিয়েছে।

জেমস ওয়েবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে একাধিক সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত করতে ইন্টিগ্রাল ফিল্ড স্পেকট্রোস্কোপি গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফের ইন্টিগ্রাল ফিল্ড স্পেকট্রোস্কোপি যন্ত্র থেকে পাওয়া স্থানিকভাবে পৃথক তথ্য এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এই তথ্য না থাকলে তিনটি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে সম্ভবত একটিকেই শনাক্ত করা যেত।

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের শুরুর দিকে কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধি ও গ্যালাক্সির বিবর্তনের সম্পর্ক বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরের একীভবন ও তা থেকে তৈরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার গবেষণার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

সূত্র: পিএইচওয়াইএস.ওআরজি

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন