বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে আমূল। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি কিংবা বিনোদন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে। এই পরিবর্তনের বাইরে নেই চিকিৎসা খাতও। একসময় যেখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পুরোপুরি নির্ভর করত চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা, রোগীর শারীরিক লক্ষণ এবং বিভিন্ন পরীক্ষার ওপর, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরো দ্রুত, সহজ ও কার্যকর করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
বর্তমানে এআই ব্যবহার করে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই রিপোর্ট বিশ্লেষণ, রোগ শনাক্ত, ওষুধ আবিষ্কার এবং রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য মূল্যায়নের কাজ করা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এআই রোগীর উপসর্গ বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শও দিচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে কিছু উদ্বেগ ও প্রশ্ন। প্রযুক্তি কি চিকিৎসকের বিকল্প হয়ে উঠবে? রোগ নির্ণয়ে ভুল হলে দায় কার? রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ থাকবে? এসব প্রশ্ন ঘিরেই আলোচনা বাড়ছেÑ চিকিৎসায় এআই কি আশীর্বাদ, নাকি নতুন ঝুঁকি?
এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় চিকিৎসা খাতে এআই ব্যবহারের বিস্তার ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বিভিন্ন হাসপাতালে রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ, অস্ত্রোপচার পরিকল্পনা এবং রোগীর চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে, মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণে এর কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
একজন চিকিৎসক যেখানে দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন, সেখানে এআই অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করতে সক্ষম হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যানসার, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ কিংবা ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তে এআই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
শুধু রোগ শনাক্ত নয়, ওষুধ গবেষণার ক্ষেত্রেও এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একটি নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে যেখানে গবেষকদের বহু বছর সময় লাগে, সেখানে এআই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য কার্যকর উপাদান দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করছে। ফলে গবেষণার সময় ও ব্যয় দুটোই কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এআইয়ের ইতিবাচক দিক
চিকিৎসা খাতে এআইয়ের অন্যতম বড় সুবিধা হলো দ্রুততা। অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারলে চিকিৎসক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে রোগীর চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়।
এছাড়া চিকিৎসা খাতে ভুলের ঝুঁকি কমাতেও এআই ভূমিকা রাখতে পারে। একজন চিকিৎসকের পক্ষে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন হলেও প্রযুক্তি স্বল্প সময়ে অনেক তথ্য পর্যালোচনা করতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে অনেক এলাকায় এখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, সেখানে এআইনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। টেলিমেডিসিন, স্বাস্থ্য অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা পরামর্শ সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং চিকিৎসকদের দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অভাব দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অনেক রোগীকে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও শহরে যেতে হয়। ফলে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হয়। এ পরিস্থিতিতে এআইভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনভিত্তিক অ্যাপ বা এআইনির্ভর ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ সম্পর্কিত ধারণা পেতে পারেন। এতে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
রোগ নির্ণয়ে গতি ও নির্ভুলতার প্রশ্ন
চিকিৎসা খাতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আশাবাদের বড় কারণ এর দ্রুত তথ্যবিশ্লেষণ ক্ষমতা। বর্তমানে উন্নত হাসপাতালগুলোয় মেডিকেল স্ক্যান বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া ছোটখাটো পরিবর্তনও প্রযুক্তি শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ এআই নির্ভর করে তথ্য ও ডেটার ওপর। যদি ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে ফলও ভুল হতে পারে। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআইয়ের বিশ্লেষণকে সহায়ক তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ
চিকিৎসা খাতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো তথ্যের নিরাপত্তা। রোগীর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষার ফলসহ ব্যক্তিগত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হলে সাইবার হামলা কিংবা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এআইভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকের বিকল্প নাকি সহকারী
এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন হলোÑপ্রযুক্তি কি একদিন চিকিৎসকের বিকল্প হয়ে উঠবে? অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে চিকিৎসকদের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করেন এআই কখনোই পুরোপুরি চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারবে না।
কারণ চিকিৎসা শুধু তথ্য বিশ্লেষণের বিষয় নয়। একজন রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বোঝা, জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ করাÑএসব ক্ষেত্র এখনো মানুষের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। এআই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারলেও মানবিক অনুভূতি বা সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে প্রযুক্তিকে চিকিৎসকের সহকারী হিসেবেই দেখা উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের ভূমিকা
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায়ও এআই ব্যবহার বাড়ছে। কিছু এআইচালিত চ্যাটবট মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু তথ্যভিত্তিক বিষয় নয়; এখানে আবেগ, সহমর্মিতা ও ব্যক্তিগত বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এআই প্রাথমিক সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারলেও এটি কখনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বিকল্প হতে পারবে না।
ব্যয় কমাবে নাকি বাড়াবে
অনেকের ধারণা, এআই ব্যবহারের ফলে চিকিৎসাব্যয় কমে আসবে। কারণ রোগ নির্ণয় ও তথ্য বিশ্লেষণে সময় কম লাগবে। তবে প্রযুক্তি স্থাপন, সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে বড় অঙ্কের ব্যয় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছেÑএই প্রযুক্তির সুবিধা কি সাধারণ মানুষ সহজে পাবে, নাকি এটি বড় হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

