ঋতুরানি শরৎ

ঋতুরানি শরৎ

গাঢ় নীল আকাশ। প্রখর রোদ। প্রচণ্ড গরম। দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে ফুটেছে সাদা সাদা কাশফুল। অনবরত বাতাসে দোল খায় ফুলগুলো। দেখতে কী চমৎকার লাগে! যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। সাদা বকেরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে। বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলেছে কালো ডাহুক। বড় পুকুরধারে জারুল গাছে বসে মাছ শিকার করে মাছরাঙা। এ ঋতুতে অনেক ধরনের ফুল ফোটে। শিউলি, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা ও বেলি ফুলের গন্ধে বাতাস ম-ম করে। বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে নদী, খাল, বিল ও ঝিলে। মাঝি পাল তুলে গঞ্জের হাটে ও বন্দরে যায় নৌকা নিয়ে। গায় ভাটিয়ালি গান—‘ও নদীরে রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল’ অথবা ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে...।’ শরতের চাঁদনি রাতে গ্রামের পরিবেশ হয় মোহনীয় ও মায়াবী। উড়ে বেড়ায় জোনাকিরা। শরৎ নিয়ে একটি ছড়া আছে, ছড়াটি এ রকম—‘শাপলা ফোটে বিলের জলে, এখন শরৎকাল, কাশ ফুটেছে নদীর তীরে, ফেলছে জেলে জাল।’

পানকৌড়ি একটি সুন্দর পাখি। এ পাখিটি ডিম দেয় শরৎকালে। এরা পাঁচ থেকে সাতটি ডিম দেয়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দুমাস শরৎ ঋতু। যাযাবর ফুল হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাও এ শরতেই ফোটে। শরতের প্রথম অংশ ভাদ্র মাস। বিশেষ কিছু কারণে বিখ্যাত। এ ভাদ্র মাসেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন করে। ভাদ্র মাসের শেষ পূর্ণিমা রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় ভেলা ভাসায়। জন্মাষ্টমী ও ভেলা ভাসানো কেন্দ্র করে মেলা বসে বিভিন্ন গ্রামে। সারা রাত চলে মুর্শিদি ও বিভিন্ন ধর্মীয় গান। বাঁশের কঞ্চি কেটে ও কলাগাছের মাধ্যমে ভেলা বানানো হয়। ভেলার মধ্যে রঙিন কাগজের ঘর বানানো হয়। সে ঘরের ভেতরে নানা ধরনের ফল দেওয়া হয়। দেওয়া হয় মিষ্টি, পায়েস ও বাতাসা। ভেলায় বানানো ঘরটি ভাসিয়ে দেওয়া হয় জোয়ার-ভাটার পানিতে। শরৎকালেই কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ফসলের বীজ বপন করে। বাংলার অন্য ঋতুগুলো থেকে শরৎকাল সম্পূর্ণ আলাদা। লালশাক, পালংশাক ও মূলা এ ঋতুতেই উৎপাদিত হয়। ফুল, ফল ও সবজির সমারোহ শরৎকালে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য শরৎ ঋতু। এটি আবহমান বাংলারই একটি রূপ। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। দুমাস পরপর এ দেশে ঋতু পরিবর্তন হয়। কখনো প্রচণ্ড গরম। আবার প্রচণ্ড ঠান্ডা! খুব বৃষ্টি! কখনো মিষ্টি রোদ। শিশির সকাল! এটা শুধুই বাংলাদেশে সম্ভব। কবির ভাষায় তাই বলতে ইচ্ছা করে—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন