আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ এক গভীর সংকটময় সময়ের মুখোমুখি হয়। নেতৃত্বহীনতার আশঙ্কা, অন্তরের শোক আর চারদিকে অনিশ্চয়তার ছায়া—এমন সময়েই খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে আবু বকর (রা.)-এর কাঁধে। কিন্তু তিনি এই দায়িত্বকে ক্ষমতার আসন হিসেবে নয়, বরং আমানত ও জবাবদিহির এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের স্থিতি, মানুষের কল্যাণ এবং ইসলামের দাওয়াতের অগ্রযাত্রা—এই তিনটি বিষয়ই হয়ে ওঠে তার চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।
নেতৃত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যে পদক্ষেপ নেন, সেটা তার অনমনীয় চরিত্র, ঈমানি দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার পরিচায় বহন করে। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদে মদিনার উপকণ্ঠ থেকে ফিরে আসা উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর বাহিনীকে তিনি আবার শাম অভিযানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। শোক ও অস্থিরতার মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত ছিল ন্যায় ও নীতির ক্ষেত্রে অবিচলতা, রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা এবং নববি নির্দেশ বাস্তবায়নের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
প্রেক্ষাপট
নবীযুগে রোম সাম্রাজ্য ছিল আরব উপদ্বীপের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিবেশী। আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল আর সেসব এলাকায় শাসন-প্রশাসন পরিচালিত হতো সরাসরি রোম সম্রাটের কর্তৃত্বে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যখন দাওয়াতি কার্যক্রম নতুন গতি পায়, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে দূত পাঠান। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে সেই ‘আহ্বাননামা’ নিয়ে যান দিহইয়া কালবি (রা.)। কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে রোম সম্রাট ইসলামের দাওয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) উপলব্ধি করেছিলেনÑরোমের সামরিক শক্তির ভীতি মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। কাজেই তাদের মনের ভয় ভেঙে দেওয়া এবং মুসলিমদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও সক্ষমতার চেতনা জাগিয়ে তোলা ছিল সময়ের দাবি। এ উদ্দেশ্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে রোমান নিয়ন্ত্রিত সীমান্তাঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। অষ্টম হিজরিতে মুতা প্রান্তরে সর্বপ্রথম বৃহৎ সংঘর্ষ ঘটে; নবম হিজরিতে তিনি নিজেই তাবুক অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং কয়েকটি অঞ্চলের সঙ্গে জিজিয়ার ভিত্তিতে সন্ধি সম্পাদন করেন। এতে মুসলিম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় হয়।
এরই ধারাবাহিকতার শেষ অধ্যায় শুরু হয় হিজরি ১১ সনের সফর মাসে। তখন (বর্তমান জর্দানের অন্তর্গত) বালকা ও ফিলিস্তিন অভিযানের জন্য উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বাহিনীর প্রস্তুতি শেষ হওয়ার অল্প সময় পরই রাসুল (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবু সেনাদল মদিনা ত্যাগ করে শামের পথে অগ্রসর হয় এবং জুরফ নামক স্থানে অবস্থান নেয়। নবীজি (সা.)-এর অসুস্থতার অবনতি ও ইন্তেকালের সংবাদে তারা মদিনায় ফিরে আসে।
উসামার বাহিনীকে আবার শামে প্রেরণের সিদ্ধান্ত
আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পরে আবু বকর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নবীজির দুনিয়া ত্যাগের তৃতীয় দিন তিনি ঘোষণা করেনÑ(আল্লাহর রাসুলের নির্বাচিত) উসামার বাহিনী সব সদস্য যেন জুরফে সমবেত হয় এবং অচিরেই শাম অভিযানের জন্য বেরিয়ে পড়ে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৩০৭)
এরপর তিনি জনতার উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন। এই ভাষণে খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করে তিনি বলেন, ‘লোকসকল! আমি আপনাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। আমি নবী নই, ভুলের ঊর্ধ্বেও নই। তাই আমি যদি সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকি, আমার অনুসরণ করবেন; আর যদি বিচ্যুত হই, আমাকে সংশোধন করে দেবেন। আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত নই। তাই আমাকে অন্ধ অনুসরণ নয়—সতর্ক সহায়তা করবেন। দুনিয়ার মোহে ডুবে মৃত্যুকে ভুলে যাবেন না। আখিরাতের কথা স্মরণ রেখে নেক আমল করবেন। (তারিখে তাবারি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৪১-২৪৫; ঈষৎ সংক্ষেপিত)
সাহাবিদের আপত্তি ও খলিফার দৃঢ়তা
আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মদিনার পরিবেশ ছিল গভীর শোক, অস্থিরতা ও মানসিক বিপর্যয়ে আচ্ছন্ন। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে মুরতাদদের আবির্ভাব এবং ধর্মদ্রোহের ফিতনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছিল। আর উসামা (রা.)-এর বাহিনীতে মদিনার অধিকাংশ বীর যোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ সাহাবি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ফলে তারা সবাই শাম অভিযানে রওনা হলে খিলাফত রাষ্ট্রের কেন্দ্র মদিনার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে—এ আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু সাহাবি খলিফা আবু বকর (রা.)-কে পরামর্শ দেন—উসামার বাহিনীকে আপাতত শামে না পাঠিয়ে মদিনার আশপাশেই মোতায়েন রাখা হোক। কারণ ধর্মদ্রোহের ফিতনা রাষ্ট্রদ্রোহে রূপ নিচ্ছে এবং মদিনাকে সুরক্ষিত রাখতে এই বাহিনীর অত্যন্ত প্রয়োজন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৩০৮)
এদিকে জুরফে অবস্থানরত সেনাপতি উসামা (রা.)-ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মদিনায় ফিরে আসার অনুমতি চাইলেন। তার অনুরোধ নিয়ে উমর (রা.) খলিফার কাছে এলেন। (আল কামিল ফিত তারিখ, ইবনুল আসির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২২৬) তবে এতসব আশঙ্কা ও পরামর্শ সত্ত্বেও খলিফা আবু বকর (রা.) নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সম্মত হলেন না। তার বিবেচনায় এটি ছিল আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ, যা কোনো অবস্থাতেই স্থগিত হওয়ার নয়।
পরামর্শ সভা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সাহাবিরা প্রথমে শান্তভাবে খলিফা আবু বকর (রা.)-কে বোঝানোর চেষ্টা করেন। উদ্ভূত সংকট—মুরতাদদের ফিতনা, নিরাপত্তার ঝুঁকি, মদিনায় সৈন্যসংকট—সবকিছু তার সামনে তুলে ধরে তাকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়। বারবার আলোচনা ও আবেদন সত্ত্বেও খলিফার অবস্থান বদলায়নি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তবে একতরফা অবস্থানে না থেকে তিনি বিষয়টি সর্বসম্মুখে আলোচনার সুযোগ দিতে সাহাবিদের নিয়ে সাধারণ পরামর্শ সভার আয়োজন করেন।
পরামর্শ সভায় দীর্ঘ মতবিনিময় হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-সহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাহাবি মদিনার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তাদের আশঙ্কা ছিল—শাম অভিযানের তুলনায় খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য এখন ধর্মদ্রোহী বেদুইনরা বড় হুমকি। খলিফা সবার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ দিতে সভা মুলতবি করেন।
মসজিদে নববিতে দ্বিতীয় দফার সাধারণ বৈঠকে তিনি চূড়ান্ত ঘোষণা দেনÑযেকোনো পরিস্থিতিতেই নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে গঠিত উসামা (রা.)-এর বাহিনী শাম অভিমুখে রওনা হবে। মদিনার প্রতিরক্ষা ঝুঁকিতে পড়লেও তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন না। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম, বন্যপশু আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কিংবা আমি ছাড়া নগরীর সবাই মারা গেলেও আমি এই সিদ্ধান্ত বদলাব না।’ (তারিখে তাবারি, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৪৫)
নীতিগত দৃঢ়তা ও নববি নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আবু বকর (রা.) কোনো আপস করেননি। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই প্রমাণ করে—তার এই সিদ্ধান্ত শুধু আবেগ নয়, গভীর ঈমান, রাষ্ট্রদর্শন ও দূরদর্শিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। (আশ-শুরা বাইনার আসালাহ ওয়াল মুআসারাহ, পৃষ্ঠা : ৮৩)
আনসারদের দাবি
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ও সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের সামনে সব সাহাবি শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করেন এবং শামের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী প্রেরণে সম্মত হন। তবে এ সিদ্ধান্তের পর আনসার সাহাবিদের পক্ষ থেকে আরেকটি আপত্তি উত্থাপিত হয়। তাদের মধ্যে উসামা ইবন জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে কিছুটা সংশয় দেখা দেয়।
আনসারদের বক্তব্য ছিল, উসামা (রা.)-এর পরিবর্তে বয়সে প্রবীণ ও যুদ্ধাভিজ্ঞ কোনো সাহাবিকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হলে তা পরিস্থিতির জন্য অধিক উপযোগী হবে। কারণ সে সময় উসামা (রা.) ছিলেন মাত্র উনিশ বা বিশ বছর বয়সি এক তরুণ। এ দাবিটি খলিফার কাছে উপস্থাপনের জন্য তারা উমর ইবন খাত্তাব (রা.)-কে পাঠান।
কিন্তু উমর (রা.) যখন বিষয়টি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সামনে উপস্থাপন করেন, তখন তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি উমর (রা.)-এর দাড়ি ধরে বলেন—‘হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার সর্বনাশ হোক। আল্লাহর রাসুল যাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তুমি কি চাও তাকে আমি সেই দায়িত্ব থেকে অপসারণ করি?!’
উমর (রা.) খলিফার দরবার থেকে বের হয়ে আনসারদের উদ্দেশে বলেন—‘তোমরা দূরে সরে যাও! তোমাদের কারণেই আমাকে খলিফার কঠোর ভর্ৎসনা সহ্য করতে হয়েছে।’
(তারিখে তাবারি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা : ৪৬)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

