আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

তত্ত্ব-বাহাসের গভীর ও সহজ সন্ধান

আহমাদ সাব্বির

তত্ত্ব-বাহাসের গভীর ও সহজ সন্ধান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘তত্ত্ব’ শব্দটি প্রায়ই একটি নেতিবাচক অর্থবহ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘তত্ত্ব কপচানো’—এই জনপ্রিয় বাক্যবন্ধে তত্ত্বচর্চাকে হালকাভাবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। তত্ত্বকে কখনো নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা, কখনো ইউরোপীয় চিন্তার অন্ধ অনুকরণ, আবার কখনো এমন কিছু বলে বিবেচনা করা হয়, যার কাজ শেষ—এখন কেবল প্রয়োগের পালা। এই মনোভঙ্গির মধ্য দিয়ে আসলে আমাদের গণপরিসরে তত্ত্ব বিষয়ে এক ধরনের অবিশ্বাস, অস্বস্তি এবং চিন্তাগত দীনতা প্রকাশ পায়। সারোয়ার তুষারের চিন্তার অর্কেস্ট্রা গ্রন্থটি এই প্রবল অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্যেই ‘তত্ত্ব’-বিষয়ক বাহাসের একটি গভীর ও প্রাসঙ্গিক সন্ধান হাজির করেছে।

গ্রন্থের সূচনাতেই সারোয়ার তুষার বাংলাদেশের গণপরিসরে তত্ত্বচর্চা বিষয়ে প্রচলিত অবস্থানগুলোর দুর্বলতা ও অসারতাকে চিহ্নিত করেন। তার মতে, তত্ত্বকে এভাবে অবজ্ঞা করার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে বোঝার গভীর সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করি। তত্ত্ব কোনো প্রস্তুত জিনিস নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তাপ্রক্রিয়া, যা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে গড়ে ওঠে। এই উপলব্ধি থেকেই তুষার ‘চিন্তার অর্কেস্ট্রা’ গ্রন্থে দুনিয়ার চিন্তার বাজারে গ্লোবাল সাউথের পাঁচজন প্রভাবশালী তাত্ত্বিকের সঙ্গে গভীর সওয়াল-জবাবের আয়োজন করেন।

বিজ্ঞাপন

এই গ্রন্থে ভারতীয় পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ও তাত্ত্বিক—দীপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্ত কবিরাজ, আদিত্য নিগম ও প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নেওয়া সাতটি সাক্ষাৎকার সংকলিত হয়েছে। এই পাঁচজনই উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও প্রভাবশালী। তাদের কাজ দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাদ, আধুনিকতা, ইউরোপকেন্দ্রিকতা, উপনিবেশায়ন, সেক্যুলারবাদ, রাষ্ট্রচিন্তা, সাব-অল্টারন স্টাডিজ ও ইতিহাসচর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এই সাক্ষাৎকারগুলো নিছক কথোপকথন নয়; বরং এগুলো বর্তমান তত্ত্বজগতের একটি বিস্তৃত ও গভীর খতিয়ান।

বাংলা ভাষার সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এ ধরনের তাত্ত্বিক সাক্ষাৎকারগ্রন্থ প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষত যেভাবে সারোয়ার তুষার প্রশ্ন সাজিয়েছেন এবং যেভাবে আত্মবিশ্বাস ও পাণ্ডিত্য নিয়ে তিনি এই পাঁচজন মশহুর চিন্তকের মুখোমুখি হয়েছেন, তা আমাদের প্রচলিত সাক্ষাৎকার-সংস্কৃতিকে ভেঙে দিয়েছে। এখানে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা কোনো অনুগত শ্রোতা নন; তিনি নিজেও একজন সক্রিয় চিন্তক, যিনি প্রশ্নের মাধ্যমে তাত্ত্বিকদের চিন্তার সীমা, দ্বন্দ্ব ও বিকাশকে উন্মোচিত করতে চান। এই জায়গাটিই চিন্তার অর্কেস্ট্রাকে অভিনব ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

যদিও এই গ্রন্থে উল্লিখিত চিন্তকরা তাদের পাঠকদের জন্য একেবারে নতুন কোনো তত্ত্ব বা তথ্য হাজির করেননি, তবুও সেটি এই বইয়ের সীমাবদ্ধতা নয়। কারণ সাক্ষাৎকারের কাঠামোয় নতুন তত্ত্ব প্রস্তাবের সুযোগ সীমিত। বরং এই গ্রন্থের শক্তি অন্য জায়গায়। এখানে দেখা যায়, কীভাবে এই চিন্তকরা তাদের দীর্ঘ চিন্তাযাত্রার আলোকে উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তবতাকে ক্রিটিক্যালি বোঝার চেষ্টা করেছেন। তারা ‘সর্বজনীন’ বলে প্রচারিত পশ্চিমা ধারণা ও তত্ত্বগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং দেখান, এই তত্ত্বগুলো বিশেষ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফসল।

দীপেশ চক্রবর্তীর ‘ইউরোপকে প্রাদেশিকীকরণ’ ভাবনা, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ বিশ্লেষণ, সুদীপ্ত কবিরাজের রাজনৈতিক ধারণার ইতিহাস, আদিত্য নিগমের আধুনিকতা ও গণতন্ত্রের সমালোচনা এবং প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাষ্ট্র ও সেক্যুলারবাদের পুনর্বিবেচনা—এসব চিন্তার ধারা বইটিতে সওয়াল-জবাবের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে। এতে পাঠক যেমন তাদের চিন্তার বিকাশের ইতিহাস বুঝতে পারেন, তেমনি পরিবর্তন ও আত্মসমালোচনার ধারাও লক্ষ করতে পারেন।

গ্রন্থটির একটি বড় অবদান হলো—এই তাত্ত্বিক আলোচনাগুলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। সারোয়ার তুষার কেবল গ্লোবাল সাউথের সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির নিরিখে এই তত্ত্বগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও সীমা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে বইটি আমাদের জন্য একটি আয়নার মতো কাজ করে, যেখানে আমরা নিজেদের বাস্তবতাকে নতুনভাবে দেখতে শিখি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই পাঁচজন চিন্তকের চিন্তাকে বইটি একধরনের পারস্পরিক বাহাসে লিপ্ত করেছে। যেহেতু তারা প্রায় একই সময়, একই ভূগোল এবং একই ধরনের সমস্যাকে কেন্দ্র করে কাজ করছেন, তাই তাদের মধ্যে চিন্তার মিল যেমন আছে, তেমনি মতপার্থক্যও আছে। সাক্ষাৎকারগুলো সেই মিল ও অমিলকে উন্মোচিত করে এবং পাঠককে একক কোনো তত্ত্বের মোহ থেকে বের করে এনে চিন্তার বহুত্বের সঙ্গে পরিচিত করে।

বাংলাদেশে প্রচলিত ‘মতবাদ’-চর্চার নামে তরুণ প্রজন্মকে প্রায়ই পুরোনো, জড় ও অনালোচিত তত্ত্বের বোঝা বইতে হয়। এই পরিস্থিতিতে চিন্তার অর্কেস্ট্রা একটি মুক্তির পথের ইঙ্গিত দেয়। এটি দেখায় যে, তত্ত্ব মানে মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং প্রশ্ন করা, দ্বিধা পোষণ করা এবং বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চিন্তাকে নির্মাণ করা। আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির বিউপনিবেশায়নের প্রশ্নে এ ধরনের তত্ত্বচর্চা অপরিহার্য।

প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য এই গ্রন্থের সারকথাকে স্পষ্ট করে তোলে—‘পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার আলোচনা বা প্রাদেশিকীকরণই আর যথেষ্ট নয়; খোদ তত্ত্বেরই নতুন তত্ত্বায়ন জরুরি।’ অর্থাৎ, আমাদের শুধু পশ্চিমা তত্ত্বের সমালোচক হলেই চলবে না; আমাদের নিজেদের বাস্তবতা থেকে নতুন তত্ত্ব নির্মাণের সাহস ও সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। চিন্তার অর্কেস্ট্রা সেই সাহস ও সম্ভাবনার পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চিন্তার অর্কেস্ট্রা কোনো সহজপাঠ্য গ্রন্থ নয়, আবার নিছক তাত্ত্বিক দুর্বোধ্যতার প্রদর্শনীও নয়। এটি একটি গভীর, সংলাপমুখর ও প্রশ্নপ্রবণ বই, যা আমাদের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ভয় ও অবজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে তত্ত্বচর্চার একটি নতুন দরজা খুলে দেয় এই গ্রন্থ। তত্ত্বকে প্রয়োগের বিপরীতে দাঁড় করানোর বদলে, বাস্তবতা বোঝার এক অনিবার্য হাতিয়ার হিসেবে ভাবতে শেখায়। এই অর্থেই চিন্তার অর্কেস্ট্রা আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল।

চিন্তার অর্কেস্ট্রা

লেখক : সরোয়ার তুষার

জনরা : সাক্ষাৎকার

প্রকাশক : গ্রন্থিক প্রকাশন

মূল্য : ৭০০

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...