আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্লোগানের দর্শন এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ

খোরশেদ মুকুল

স্লোগানের দর্শন এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ

স্লোগান আন্দোলনের ভাষা, দৃশ্যমান ও শ্রুতিগ্রাহ্য প্রকাশভঙ্গি। স্লোগান আগে থেকে ঠিক করা থাকে না। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি স্লোগান ও স্লোগানের ভাষা ঠিক করে দেয়। এই স্লোগান অতীতের আজাদির ইতিহাস থেকে যেমন আসতে পারে, তেমনি সময়ের কাঠখড় পুড়িয়েও তৈরি হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্লোগানের নির্দিষ্ট কোনো রচয়িতা থাকে না। ঐক্যবদ্ধ সৃষ্টি বলা যায়। তাই সবাই এটিকে খুব সহজে আপন করে নেয়, নিজেরই ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তবে যা-ই বলি না কেন, স্লোগান হয় জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের একান্ত হাতিয়ার। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, স্লোগানের ভাষা ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও লক্ষ্য থাকে এক ও অভিন্ন—ইনসাফ কায়েম। বিগত সময়ের কিছু আন্দোলন এই তত্ত্বকে সমর্থন করে বলেই মনে হয়। যেমন অরেঞ্জ বিপ্লব (Orange Revolution): ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো ইউক্রেনের গণ-আন্দোলনে কমলা রঙে ছেয়ে গিয়েছিল কিয়েভের রাজপথ।

আরব বসন্ত (Arab Spring), ২০১০ সালের শেষে এবং ২০১১ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সমষ্টিগত নাম। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অসাম্য এবং রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার অর্জন করা।

বিজ্ঞাপন

স্লোগান কেবল শব্দ বা বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ নয়; এটি সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিও বটে, যা জনগণের আবেগ, চেতনা ও অভিন্ন লক্ষ্যকে সংহত করে তোলে। স্লোগানের দর্শন বলতে বোঝায়, এই সংক্ষিপ্ত ও প্রভাবশালী উচ্চারণের ভেতর নিহিত আদর্শ, সংগ্রামের স্পৃহা এবং সমাজ পরিবর্তনের বীজতত্ত্ব। মানবসভ্যতার প্রথম দিকেই দেখা যায়, যুদ্ধে সৈন্যদের মনোবল জাগাতে, জনগণকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে বা ধর্মীয় আনুগত্য প্রকাশে ছোট ছোট আহ্বানে ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন স্লোগান । যেমন প্রাচীন গ্রিক যুদ্ধে সৈন্যদের জন্য যুদ্ধঘোষণার রণধ্বনি, বাংলা-পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’; স্বাধীন দেশে হরেক স্লোগান বের হলেও এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগানটি আলোড়ন তুলেছিল। ইতিহাসে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, বিপ্লব কিংবা মুক্তির আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল শক্তিশালী স্লোগান। এগুলো শুধু আওয়াজ নয়; মানুষের মননে পরিবর্তনের অগ্নিশিখা।

বাঙালি সংস্কৃতিতে স্লোগান এক ধরনের মৌখিক ঐতিহ্যও বটে। মিছিলের মন্ত্র, কবিতা থেকে উঠে আসা আহ্বান, কিংবা গ্রামীণ বিদ্রোহের ছড়া—এসবই স্লোগানের বিস্তার ঘটিয়েছে। এ ঐতিহ্য দেখা যায়, কৃষক আন্দোলনে ‘লাঙল যার জমি তার’ ধ্বনিতে, ভাষা আন্দোলনে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর দাবিতে, উনসত্তরের গণজাগরণে ‘তোমার-আমার ঠিকানা—পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’ কিংবা ‘আসাদের মন্ত্র-জনগণতন্ত্র’ ইত্যাদি স্লোগানে। অতএব, স্লোগান আমাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের অংশ।

রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্লোগান হলো গণমানুষকে সংগঠিত করার প্রধান হাতিয়ার। এটি তাদের লক্ষ্য ও কর্মসূচির সহজ প্রকাশ। দার্শনিকেরা মনে করেন, স্লোগান হলো ধারণার ঘনীভূত রূপ, বড় আকারের চিন্তার ছোটো আকারের মানচিত্র, যা একই সঙ্গে মানুষের আবেগ, যুক্তি আর কর্মকে জাগিয়ে তোলে। যেমন মার্ক্সবাদী আন্দোলনে শ্রমিক সংহতির আহ্বান—‘Workers of the world, unite!’ কবি ও সাহিত্যিকেরা স্লোগানকে সৃজনশীল প্রতিরোধ ও শিল্পিত প্রকাশের ভাষা হিসেবে দেখেন। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইনগুলো অনেক সময় স্লোগানে রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে স্লোগান হলো আশা, প্রতিবাদ ও সংহতির প্রতীক। এটি একক কণ্ঠকে বহুস্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। বহুকণ্ঠকে এক করে তোলে।

ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে একাধিক স্লোগানধর্মী বক্তব্য সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; যেমন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ এটি কেবল তাওহিদের ঘোষণা নয়, বরং এটি ছিল মক্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক চরম চ্যালেঞ্জ। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনীতি ও যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।

স্লোগানের দর্শন কেবল রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জনগণের চেতনা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ঐতিহ্যের ভেতর স্লোগান হলো প্রতিরোধের ধ্বনি, আর দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি মানুষের মুক্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান। সংক্ষেপে বলা যায়, স্লোগান হলো সংক্ষিপ্ত ভাষায় দীর্ঘ ইতিহাস, গভীর দর্শন এবং একাত্ম মানুষের কণ্ঠস্বর।

সমাজবিজ্ঞানে স্লোগানকে দেখা হয় একটি আদর্শ বা চেতনার ঘনীভূত, আবেগনির্ভর ও সংক্রামক উচ্চারণ হিসাবে। স্লোগানের গুরুত্ব নিয়ে ইতিহাসে প্রথম কারা আলোচনা করেছেন, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কিছুটা কঠিন বটে। কারণ স্লোগান মূলত রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকেই জড়িত। স্লোগানে প্রতিফলিত হতে পারে রাজনৈতিক আদর্শ ও শ্রেণিগত আবেদন। ফরাসি বিপ্লবের ‘Liberty, Equality and Fraternity’ স্লোগানটি ফরাসি বিপ্লবের ঘোষিত আদর্শকে নির্দেশ করে, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্টে ব্যবহৃত ‘We are 99%’ ঘোষণাটি আমেরিকান সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অসাম্যকে প্রকটিত করে। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস স্লোগানকে শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে চিন্তা করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের (১৮৪৮) ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও’—আধুনিককালের প্রথম বৈশ্বিক স্লোগান বলেই অনেকে মনে করেন। আলি শারিয়াতির মতে, ‘স্লোগান হলো আত্মশুদ্ধি, প্রতিরোধ ও বিপ্লবের সামগ্রিক প্রকাশ। তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি বিপ্লবের প্রয়োজন একজন হোসাইন এবং প্রতিটি কারবালার দরকার একটি স্লোগান।’ সময়োপযোগী একটা স্লোগান জটিল রাজনৈতিক ভাবকে সহজ ভাষায় মানুষের মাথায় গেঁথে দিতে কাজ করতে পারে মোক্ষম অস্ত্রের মতো, যা মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। স্লোগান শত্রু-মিত্র চিনতে শেখায়। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের কথামতো—‘স্লোগান দিতে গিয়ে আমি বুঝতে শিখি/ কে ভাই কে দুশমন/ স্লোগান দিতে গিয়ে আমি/ সবার সঙ্গে আমার দাবি/প্রকাশ্যে তুললাম।’

দেশে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গত জুলাইয়ে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তরুণদের মধ্যে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি খুব প্রভাব ফেলে, মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে এই স্লোগান। প্রবল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি বেশ আলোচিত ছিল, আছে। তবে এটি নতুন করে আলোচনায় আসে যখন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের প্রায় সব শীর্ষ নেতা বক্তব্যের ইতি টেনেছেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (Inquilab Zindabad) স্লোগানটি দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক জাফর আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব। আর জিন্দাবাদ মানে অভিনন্দন জানানো। ফলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের মানে হলো বিপ্লবকে অভিনন্দন জানানো। অবশ্য ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব তার লেখায় ইনকিলাব জিন্দাবাদের অর্থ হিসেবে লিখেছেন, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ পরে অবশ্য অধ্যাপক জাফর আহমেদ ভূঁইয়া আরেক সাক্ষাৎকারে বলেন, অনেকের মতে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি এসেছে মূলত আরবি ইকলাব শব্দ থেকে, যার অর্থ পরিবর্তন। তবে মূল আরিব শব্দমূল হলো ক্বলব- ক্বফ, লাম, বা। আর ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি উর্দু ও ফারসি ভাষার মিশেল। অনেকে এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন, ‘Long Live the Revolution’ যার মানে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। স্লোগানটির অন্তর্নিহিত দর্শন হলো, শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সমাজে ন্যায় ও ন্যায্যতার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি। এই কারণে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ কেবল স্লোগান নয়, বরং গভীর পরিবর্তনমুখী চেতনার নান্দনিক প্রতীক ও দার্শনিক প্রত্যাশা।

প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের এক লেখায় উঠে এসেছে এ স্লোগানের আদ্যোপান্ত। ২০২২ সালের ২৯ মে ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি (১৮৭৫-১৯৫১) প্রথম স্লোগানটি ব্যবহার করেন। ওই বছর কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯২১ সালের অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার সময় ভাষণে তিনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার (আজাদ-এ-কামিল) দাবি উপস্থাপন করেন। সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পর কমিউনিস্ট মনোভাবী মাওলানা হাসরাত মোহানি ইউনাইটেড সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের (ইউএসএসআর, বর্তমান রাশিয়ান ফেডারেশন) অনুকরণে ভারতেও একটি কনফেডারেশন স্টাইলের সংবিধান দেখতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাবে ছয়টি ফেডারেশন ছিল—১. পূর্ব পাকিস্তান ২. পশ্চিম পাকিস্তান ৩. মধ্য ভারত ৪. দক্ষিণ-পূর্ব ভারত ৫. দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত এবং ৬. হায়দ্রাবাদ ডেকান। কিন্তু সেটি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় তিওয়ারি জানিয়েছেন, ‘১৯২১ সালে কংগ্রেসে প্রথমবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব দেন হাসরাত মোহানি। এর বিরোধিতা করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী।

যদিও দুজনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্বও ছিল। মহাত্মা গান্ধী যখন ‘খাদি আন্দোলন’ শুরু করেন, মোহানি এর বিরোধিতা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এর ফলে পরোক্ষভাবে শ্রমিকরা শাস্তির মুখে পড়বেন।’ পরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধ জনপ্রিয় করে তোলেন ভগৎ সিং।

কবি, সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী হাসরাত মোহানির আসল নাম মাওলানা সৈয়দ ফজল-উল-হাসান। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের সংযুক্ত প্রদেশের উন্নাও জেলার মোহন নামক এক শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। হাসরাত মোহানির পূর্বপুরুষরা ইরানের রাজাভি খোরাসান প্রদেশের রাজধানী নিশাপুরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ‘হসরত’ ছদ্মনামে উর্দু কবিতা লিখতেন। আর ‘মোহানি’ হচ্ছে তার জন্মভূমি। সাই নদীর তীরে ‘মোহান’ শহরটি ভারতের উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলায় অবস্থিত। ‘মোহ’ ও ‘হান’ এই দুটি শব্দ মিলে ‘মোহান’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। ১৯০৩ সালে বিএ পাস করেন মোহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ থেকে। পরে এই কলেজটি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

১৯০৪ সালে হাসরাত মোহানি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং জাতীয় আন্দোলনে শামিল হওয়ার পর ১৯০৫ সালে বালগঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে ‘স্বদেশী আন্দোলনে’ অংশ নেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠন করতে ‘উর্দু-ই-মুয়াল্লা’ (Urdu-e-Mualla) নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ প্রকাশ করতেন মোহানি। একসময় এই সাংবাদিকতার জেরে ব্রিটিশদের রোষানলে পড়েন তিনি। ব্রিটিশরা তাকে তিন হাজার টাকা জরিমানা করে।

১৯৪৬ সালে ভারতে গণপরিষদ গঠনের সময় উত্তরপ্রদেশ থেকে নির্বাচিত হন হাসরাত মোহানি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের বিরোধিতা করেন তিনি। ১৯৫১ সালের ১৩ মে, ভারতের মাটিতে (লখনউ-এ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাসরাত মোহানি। তার প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থের নাম হচ্ছে যথাক্রমে—১. ‘কুল্লিয়াত-ই-হসরত মোহানী’ (হাসরাত মোহানির কাব্য সংকলন); ২. শারহ-ই-কালাম-ই-গালিব (গালিবের কাব্যের ব্যাখ্যা); ৩. নুকায়েত-ই-সুখান (কবিতার গুরুত্বপূর্ণ দিক); ৪. মুশাহিদাত-ই-জিন্দান (জেলখানায় পর্যবেক্ষণ); ৫. তাজকিরাতুল সুয়েরা (কবিদের ওপর প্রবন্ধ)।

হাসরাত মোহানি প্রথম এই স্লোগান দিলেও এটিকে জনপ্রিয় করতে ভগৎ সিংয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯২৯-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে এ স্লোগান ভগৎ সিং এবং তার ‘নওজোয়ান ভারত সভা’ এবং একই সঙ্গে তার হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (এইচএসআরএ) প্রধান রণহুংকার হয়ে ওঠে। এই ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিপ্লবীদের জন্য নিছক একটি আবেগময় রণহুংকার ছিল না, বরং এর মধ্যে একটি উচ্চ আদর্শ নিহিত ছিল। এইচএসআরএ এটিকে ব্যাখ্যা করেছে এভাবে—‘বিপ্লব পুঁজিবাদ এবং শ্রেণিবৈষম্য ও সুযোগ-সুবিধার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেবে... বিপ্লব এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেবে।...এটি একটি নতুন সামাজিক ব্যবস্থা।’

১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ভগৎ সিং এবং বিকে দত্ত দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা মারার সময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিয়েছিলেন। পরে একই বছরে প্রবীণ সাংবাদিক ও মডার্ন রিভিউ অব কলকাতার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ (ইনকিলাব জিন্দাবাদ) স্লোগানকে বিদ্রুপ করে একটি লেখা লেখেন। ভগৎ সিং এ লেখার বক্তব্যকে কাউন্টার দিয়ে নিজের অবস্থান ও স্লোগানটির ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “যে অর্থে বিপ্লব (ইনকিলাব) শব্দটি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ফ্রেজ বা শব্দগুচ্ছে ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো চেতনা এবং অগ্রগতির জন্য পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। আমজনতা সাধারণত প্রতিষ্ঠিত নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং পরিবর্তনের হাওয়া দেখলেই অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে শুরু করে... পুরোনো শৃঙ্খলার পরিবর্তন হওয়া উচিত, অচলায়তন ভেঙে নতুনের জন্য স্থান করে দেওয়া অর্থেই আমরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিই।”

ভগৎ সিং ১৯২৯ সালের ৬ জুন আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তাতে তিনি এ বিষয়কে আরো পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ইনকিলাব বা বিপ্লব বোমা ও পিস্তলের সংস্কৃতি নয়। আমাদের বিপ্লবের অর্থ হলো প্রকাশ্য অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেওয়া।’ ভগৎ সিং তার জেলের ডায়েরিতে লিখেছিলেন, একটি আমূল বিপ্লব কোনো ইউটোপিয়ান (কল্পিত সমাজব্যবস্থা) নয়। তিনি সেখানে বলেছিলেন, ‘যা ইউটোপিয়ান, তা হলো একটি আংশিক ও একচেটিয়াভাবে রাজনৈতিক বিপ্লবের ধারণা, যা ঘরের স্তম্ভগুলোকে দাঁড় করিয়ে রাখে।’

এটি ফের আলোচনায় আসে ২০২০ সালে, যখন দিল্লির দাঙ্গায় অভিযুক্ত বাম নেতা উমর খালিদ কোন প্রেক্ষাপটে এ স্লোগান দিয়েছিলেন, তা জানতে চেয়েছেন উচ্চ আদালত। তাই নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল। জানতে চাওয়ার সময় একজন বিচারক বলেছিলেন, ‘বিপ্লব’ যে ‘সব সময় রক্তপাতহীন হয় না’ তা এই শব্দের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

বাংলাদেশে এই স্লোগানটিকে জনপ্রিয় করার পেছনে পিনাকী ভট্টাচার্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি তার প্রতিটি ভিডিও শেষ করেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (Inquilab Zindabad) স্লোগানটি দিয়ে। পিনাকী ভট্টাচার্য হলেন ফ্রান্সে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি প্রবাসী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও চিকিৎসক। তিনি ২০১৮ সালে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় আত্মগোপনে থেকে আলোচিত ছিলেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টর সমালোচনাকারী হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর তিনি ১৯টি বই লিখেছেন। আরেকজন ব্যক্তির কথা না বললেই নয়; আধিপত্যবাদবিরোধী আইকন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত শহীদ ওসমান হাদি। তিনি জুলাই শহীদদের অধিকার রক্ষা ও আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির জন্য আলোচনায় আসেন। তিনি ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

স্লোগানটির উৎপত্তি এবং বিকাশের ধারাবাহিকতায় জড়িয়ে আছে বাম আদর্শ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্লোগানটির বিভিন্ন ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। যেমন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এটি রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য। স্বাধীনতার পরে এটি সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট ও বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের পক্ষে ছিল। পরবর্তী সময়ে এটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও কিছুটা গুরুত্ব পায়, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। তাছাড়া ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগানটি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এখনো দেয়। বাংলাদেশেও অতীতে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের এ স্লোগান দিতে শোনা গেছে। এখন প্রশ্ন, আমরা কীভাবে সেটিকে গ্রহণ করেছি—বাম আদর্শের ধারক কিংবা প্রচারক হিসেবে, নাকি শুধুই ইনসাফ কায়েমে বিপ্লবকে দীর্ঘজীবী করতে।

এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবিক ব্যাখ্যা দেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। এনসিপির আত্মপ্রকাশে এই স্লোগানের নতুন ব্যবহার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ স্লোগানটা তারা (ছাত্ররা) দিচ্ছে—সেটা কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দিচ্ছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা এরই মধ্যে ক্লিয়ারলি (পরিষ্কারভাবে) বলে দিয়েছে, তারা মধ্যপন্থি দল।’ তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পরিচয় প্রকাশ করে কিছু প্রতীক দিয়ে—দলের পতাকা থাকে, লোগো থাকে, স্লোগান থাকে। মহিউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, “তাদের (অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র) মতে, ৫ আগস্ট যদি একটি বিপ্লব হয়, সে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক—সেই সেন্সে (অর্থে) এ স্লোগান ঠিক আছে।’ তিনি বলেন, ‘জাসদ একসময় স্লোগান দিত—‘বাংলার মেহনতি মানুষের জয় হোক, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিএনপি দেয় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান। এখন তারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছে, তো সেটা দেখা যাক....।”

স্লোগান ইতিহাসে মানুষের মুক্তির ভাষা, আর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ সেই ভাষার ঐতিহ্যিক ও শক্তিশালী প্রতিধ্বনি। এটি যেমন ন্যায় ও সমতার একাডেমিক ও দার্শনিক প্রতীক, তেমনি কাব্যিকভাবে বিপ্লবী হৃদয়ের বজ্রধ্বনি। সময়ের ধারাবাহিকতায় অন্যায়ের প্রতিবাদে আদর্শ ও ইনসাফের লড়াইয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জারি থাকুক ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...