বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, পরমাণু অস্ত্রের হুমকি ও শক্তিধর দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে মানুষ বিভাজন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বদলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায়। ৩৪টি দেশের ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর চালানো এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানিয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন।
নিবন্ধে ব্রাউন বলেন, বিশ্ব ক্রমেই নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে শক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাও কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রাউনের মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আন্তর্জাতিক আইনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতেও মানবাধিকার, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা ও আইনের শাসনের প্রতি অবহেলা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে বলে মনে করেন ব্রাউন। ফোকালডাটার মাধ্যমে রকফেলার ফাউন্ডেশনের জন্য পরিচালিত জরিপে ৫৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, নিজেদের জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে। মাত্র ২০ শতাংশ এতে আপত্তি জানিয়েছেন।
জরিপে আরও দেখা গেছে, বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক সহায়তায় সরকারি উদ্যোগ চায়। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা চায়, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ ও নিরক্ষরতা মোকাবিলায় কাজ করবে।
ব্রাউন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে যারা নিজেদের সমাজে সক্রিয় এবং বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তারাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে বেশি অবস্থান নেন। তাদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমর্থনের প্রবণতা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। তাই আন্তর্জাতিক ঐক্য ফিরিয়ে আনতে হলে আগে নিজ নিজ দেশের সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের বন্ধন শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রভাবের বাইরে অন্য দেশগুলোর ভূমিকাও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন ব্রাউন। তাঁর উল্লেখ করা জরিপে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সম্ভাব্য ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কারণে তাদের পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে বড় বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের প্রতি মানুষের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে পারে।
ব্রাউনের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া ছাড়া অন্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকে ৭৫ শতাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও তাদের হাতে ১৫টির মধ্যে ১২টি ভোট এবং পাঁচটি ভেটোর মধ্যে দুটি রয়েছে। তাই জলবায়ু সংকট, মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ব্রাউন বলেন, বিশ্ব এখন এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সময়ে শক্তির রাজনীতির বদলে সহযোগিতা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তার মতে, বিশ্বের সাধারণ মানুষ একটি ভালো ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যৎ চায়—এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

