হিমালয়ের হিমবাহ পুরো গলে যাওয়ার শঙ্কা, নতুন বিপদের ঝুঁকি

হিমালয়ের হিমবাহ পুরো গলে যাওয়ার শঙ্কা, নতুন বিপদের ঝুঁকি

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষের প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর হিমালয়ের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে হিমালয়ে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং পাহাড়ের মাটির নিচে জমে থাকা বরফ বা পারমাফ্রস্টও গলতে শুরু করেছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে হিমবাহ ও পাথরের বড় অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় এখন শুধু বরফ গলার কারণে নয়, বরফ গলে পাহাড়ের ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার কারণেও ঝুঁকির মুখে। হিমবাহের নিচের ও আশপাশের বরফ এবং পারমাফ্রস্ট একসময় পাহাড়ের শিলাকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করত। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সেই প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে ভূমিধস থেকে শুরু করে আকস্মিক বন্যা পর্যন্ত একাধিক বিপর্যয় পরপর ঘটতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ ও পাহাড়ের বরফ-শিলা কাঠামো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এতে হঠাৎ হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিজ্ঞানীরা। এ ধরনের বিপদের আরেকটি কারণ হলো হিমালয়ের নদী উপত্যকায় মানুষের বসতি ও অবকাঠামো দ্রুত বাড়ছে। সড়ক, হোটেল, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে নদীর কাছাকাছি এলাকায়। ফলে পাহাড়ে কোনো বড় ধস বা বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।

২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, সেখানে ৫ দশমিক ২ মাত্রার যে কম্পন রেকর্ড হয়েছিল, সেটি কোনো ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ধস ও বিপুল পরিমাণ বরফ-পাথর নিচে নেমে আসার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ের ওপরের বরফ ও শিলার বিশাল অংশ ভেঙে নিচে পড়ার পর তা নদীতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথরের প্রবাহ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে নদীর পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে নদীতীরবর্তী বসতি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে পানির নিচে চলে যায়।

ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। তবে নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের আগে ওই নদী ব্যবস্থায় গত বছরও হিমবাহ সম্পর্কিত বন্যা হয়েছিল। এতে ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, একই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বতমালা হিমালয়। এই অঞ্চলের হিমবাহ ও নদীগুলো এশিয়ার বিপুল জনগোষ্ঠীর পানি, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর ওপর প্রায় ২১০ কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতি নির্ভরশীল। ফলে পাহাড়ি এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নেপাল বা তিব্বতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা তাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ও নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে নেপাল, চীন ও নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী কয়েক দশকে হিমবাহের পরিবর্তন থামানো কঠিন হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় বিশেষজ্ঞদের কাছে সেই প্রস্তুতি জোরদারের জন্য নতুন করে একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ন্যাচার, এপি নিউজ ও গ্লোবাল ইস্যুজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন