সন্তানের সার্বিক বিকাশে সাধারণ জ্ঞান, এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রম, বিতর্ক ও শিল্পচর্চার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর এসব দক্ষতা অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে বাবা-মা ও শিক্ষকের। শিশুর শেখার আগ্রহ জাগানো, তার প্রতিভা চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক নির্দেশনা, উৎসাহ ও সহায়তা। তাই এই ক্ষেত্রগুলোয় বাবা-মা ও শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম।
প্রথমত, সাধারণ জ্ঞান অর্জনে বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার। সে যা দেখে, শোনে এবং অভ্যাস করে, তার বড় অংশই আসে ঘরের পরিবেশ থেকে, অর্থাৎ পরিবার থেকে। বাবা-মা যদি নিয়মিত খবর পড়েন, বই পড়তে উৎসাহ দেন, শিশুকে প্রশ্ন করতে অনুপ্রাণিত করেন, তবে তার কৌতূহল এবং জানার আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে, ভ্রমণে নিয়ে গেলে এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানালে তাদের চিন্তার পরিধি বিস্তৃত হয়। এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকাই প্রধান।
অন্যদিকে শিক্ষকের ভূমিকা হলো এই সাধারণ জ্ঞানকে কাঠামোবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে শেখানো। শ্রেণিকক্ষে ওপেন ডিসকাশন, কুইজ, প্রেজেন্টেশন বা প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষাদান শিশুকে ব্যাকরণগত দিক দিয়ে সঠিকভাবে ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে এবং যুক্তি সাজাতে সাহায্য করে। শিশুর বোঝার স্তর অনুযায়ী শিক্ষক তথ্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করলে বিষয়গুলো তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এতে কোনো নতুন বিষয় আয়ত্ত করা এবং জ্ঞানলাভ করা শিশুদের জন্য সহজ হয়।
দ্বিতীয়ত, এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রমে বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একাডেমিক চাপের কারণে বাবা-মা মনে করেন, অতিরিক্ত কার্যক্রম সময়ের অপচয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব কার্যক্রমই শিশুর আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, টিমওয়ার্ক, নেতৃত্বগুণ ও শারীরিক-মানসিক সুস্থতা গঠনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে।

বাবা-মা যদি সন্তানকে খেলাধুলা, সংগীত, নাচ, স্কাউট বা বিজ্ঞানমেলায় অংশগ্রহণে উৎসাহ দেন, তার সময়কে সঠিকভাবে ম্যানেজ করতে সাহায্য করেন এবং ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টাকে বেশি মূল্যায়ন করেন, তাহলে শিশু এসব বিষয় থেকে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
শিক্ষকের ভূমিকা এখানে হলো শিশুকে সঠিক কার্যক্রম বেছে নিতে সহায়তা করা, তার প্রতিভা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী পরিচালনা করা। স্কুলের নীতিমালা, ক্লাব কার্যক্রম, নিয়মিত অনুষ্ঠান—এসবের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিজেদের আবিষ্কার করার সুযোগ তৈরি করে দেন।
তৃতীয়ত, ডিবেট বা বিতর্কচর্চায় বাবা-মায়ের ভূমিকা হলো শিশুকে মতামত প্রকাশে সাহস দেওয়া, উৎসাহিত করা। অনেক শিশুই নিজের কথা বলতে সংকোচবোধ করে। বাবা-মা যদি ঘরে সন্তানের মতামত শোনেন, ভুল হলেও তাকে সঠিক বিষয়টি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলেন যে, ‘বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের কথা ও যুক্তি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ,’ তাহলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক শুধু সহজ নয়, বন্ধুত্বপূর্ণও হবে। বাবা-মা যদি যুক্তি দিতে উৎসাহ দেন, তবে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিতে শিখবে।

শিক্ষকের ভূমিকা হলো যুক্তি উপস্থাপন, কাঠামোবদ্ধ বক্তব্য তৈরি, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ভদ্রতাপূর্ণ যোগাযোগ শেখানো। বিতর্ক ক্লাব পরিচালনা, নিয়মিত প্র্যাকটিস এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব।
শিল্পচর্চায় বাবা-মায়ের ভূমিকা হলো সন্তানের সৃজনশীলতার বিকাশে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। আঁকাআঁকি, কবিতা, গান—যেকোনো শিল্পচর্চা শিশুর মনের দরজা খুলে দেয়। বাবা-মা যদি সন্তানকে ভুলের ভয় না দেখিয়ে স্বাধীনভাবে সৃজনশীল হতে দেন, তার চিন্তা-ভাবনাকে মূল্য দেন, তবে তার শিল্পীসত্তা বিকশিত হবে।
শিক্ষকের ভূমিকা হলো কৌশলগতভাবে এসব দক্ষতা আরো শানিত করা। তারা শিশুকে সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম দিতে পারেন।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, শিশুর সার্বিক বিকাশে বাবা-মা ভিত্তি নির্মাণ করেন এবং শিক্ষক সেই ভিত্তির ওপর গড়ে তোলেন তার দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ। দু’পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টা থাকলেই একটি শিশু হয়ে উঠতে পারে আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও জ্ঞানসমৃদ্ধ একজন সফল মানুষ।
নাঈমা ইসলাম
সাইকোলজিস্ট, বিআইএসসি অ্যান্ড টিসিসি

