বাঙালিরা অতিথিপরায়ণ; আর উৎসবে নারীরা ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাবারের নানারকম পদ তৈরি করতে পছন্দ করেন। নিজের পরিবারের মানুষ এবং অতিথিদের খাওয়াতে ভালোবাসেন।
একই পরিবারে একসঙ্গে বাবা-মা, ভাই-বোনের বসবাস। যৌথ পরিবারে আরো সদস্য থাকতেন, মজাও বেশি হতো। আগের মতো যৌথ পরিবার নেই বললেই চলে। পরিবার দিনে দিনে ছোট হয়ে আসছে। তবে উৎসবের দিনগুলো নারীদের কীভাবে কাটে—এ কথা কখনো কি ভেবে দেখেছেন! উৎসবের আগের দিন গভীর রাত অবধি, আবার কখনো কখনো দু-তিন দিন আগে থেকে মা-খালা-ফুফু, বোন-ভাবি ও চাচি-মামিরা রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
হরেক পদের রান্না ছাড়াও হয়তো আমাদের উৎসব আয়োজন সম্পন্ন হতো, তবে তাতে কারো মন ভরে না! সবার মন রাখার দায়িত্ব নিজ কাঁধে টেনে নেওয়ার অসীম ধৈর্য নিয়ে নারীরা জন্মেছেন। এছাড়া উৎসবকেন্দ্রিক ঘর ঝাড়া, ধোয়া-মোছা আর কেনাকাটার দায়িত্ব তো নারীর ওপরে রয়েছেই।
আর কোরবানির ঈদে তো নারীর কাজ বহুগুণে বেড়ে যায়। বাজার-সদাই করার লম্বা তালিকা তৈরি করা থেকে শুরু নানারকম সাংসারিক কাজ। বাজার করার পরে সবকিছু ঠিকমতো গুছিয়ে রাখা। তাছাড়া হরেক পদের রান্নাবান্না তো আছেই।
এই সবকিছু গুছিয়ে আনার পর বলুন তো উৎসবের দিন তারা কী করেন? ক্লান্তিতে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন! সে ফুরসত মেলে না। বাসায় আগত অতিথিদের আপ্যায়ন এবং কোরবানির মাংস বিলানোর পরে ফ্রিজে রাখা নিয়ে ব্যস্ততা। আর রান্নার ব্যস্ততা তো আছেই।
সংসারে নারীদের শ্রমসাধ্য এই সাংসারিক কর্মকাণ্ড জীবনাচরণের অংশ হিসেবে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে পরিণত বয়সে এই সময়ে এসে এখন মনে হয়, উৎসবটা আমাদের মায়েদের জন্যও সমান আনন্দের হওয়া উচিত। যদি এমন হতো—ঈদের দিনটি তাদের সব কাজ থেকে মুক্তি পাওয়া ফুরফুরে একটি দিন! যদিও নারীরা এই হাজার ব্যস্ততার মধ্যেই সুখ খোঁজেন। পারিবারিক এসব কাজকর্মের মধ্যেই তারা উদ্যাপনের আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। তাই তো উৎসব উদ্যাপন ছাড়াও হঠাৎ বেড়াতে আসা কোনো অতিথিকে ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে রান্নাঘরে গিয়ে পঞ্চব্যঞ্জন রাঁধতেও প্রশান্তিতে তাদের সব ক্লান্তি উবে যায়।
অথচ নানান পদের রান্নাবান্নায় নিজেকে নিয়োজিত করে সময়টা ব্যয় না করলে বেশ জমিয়ে গল্প আর আড্ডা দিয়ে সময়টা উপভোগ করতে পারতেন! পারলেও সেটা তারা করেন না। এটাই অতিথিপরায়ণতা বা বাঙালির আপ্যায়নের সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে অদৃশ্য ভালোবাসা ও হৃদ্যতা।
পরিবারে দায়িত্বশীল একজন নারী সংসারের ছোট-বড় সবার চাহিদার খেয়াল রাখেন। অথচ তার খেয়াল পরিবারের কয়জন রাখেন! প্রচলিত প্রথা ভেঙে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে খুব কম নারীই আগ্রহী। তবে কি বাঙালি নারীরা কখনোই আনন্দ উদ্যাপন করতে শেখেনি, নিজেকে সুখী করতে শেখেনি, ভালোবেসে নিজেকে উপহার দিতে শেখেনি! নারীর উৎসব তাই পরিণত হয়েছে কর্তব্যনিষ্ঠায়।
পরিবারকে ঘিরেই নারীদের সব চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ! নিজেকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার তার সময় নেই। নিজের স্বস্তির কথা না ভেবে পরিবারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালনেই তাদের শান্তি! তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত সাংসারিক কাজে নারীদের সহযোগিতা করা। তাদের সামান্য বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া। সবাই মিলেমিশে কাজ করলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। এতে পারিবারিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়। আর তবেই ঈদের আনন্দ আরো দ্বিগুণ হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

