উদ্যোক্তারা কতটা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখে

আব্দুল্লাহ নাজিম আল মামুন

উদ্যোক্তারা কতটা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখে

বর্তমান সময়ে ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফ্রিল্যান্সিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মতো খাতে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, অনলাইন উদ্যোগ, হস্তশিল্প, কৃষি, ফ্যাশন, প্রযুক্তিসহ রপ্তানি ব্যবসাতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। এর মাধ্যমে শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানই নয়, অন্যদের জন্যও কর্মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের জিডিপিতে বর্তমান নারীর অবদান ১০ শতাংশ এবং উদ্যোক্তার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করা হলে তাদের জিডিপিতে অবদান হবে ২৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন ১ কোটি ১৮ লাখ। নারী উদ্যোক্তার হার মোট ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে আশার কথা হলো, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যেসব উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, তার ৬০ শতাংশই নারী। নারী উদ্যোক্তারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের অনেক সময় বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় এবং সেই চ্যালেঞ্জ বা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চ্যালেঞ্জসমূহ

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা : বাংলাদেশে একজন নারী উদ্যোক্তা হতে চাইলে সর্বপ্রথম বাধা আসে পরিবারের পক্ষ থেকে। বলা হয়, ‘তুমি নারী, তুমি পারবে না, তোমার দ্বারা হবে না।’ এ ধরনের মনোভাব আমাদের পরিবারে ও সমাজে একটি অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার হিসেবে গৃহীত হওয়া উচিত, যা নারীর উৎসাহ, সক্ষমতা ও অধিকারকে অস্বীকার করে এবং সমাজে লিঙ্গবৈষম্য সৃষ্টি করে। এ ধরনের চিন্তাভাবনা ঐতিহাসিকভাবেই বিদ্যমান। এটি নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় বাধা সৃষ্টি করে।

বিনিয়োগ স্বল্পতা : নারীরা পুরুষদের তুলনায় কম বিনিয়োগের সুযোগ পান, যা তাদের ব্যবসার প্রসারকে সীমিত করে এবং এটি নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসা শুরু করতে এবং পরিচালনা করতে পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন হয়; কিন্তু অনেক নারী উদ্যোক্তা সহজে ব্যাংকঋণ বা বিনিয়োগকারীদের সমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। আর্থিক বৈষম্য, নির্দিষ্ট পদে আটকে থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এজন্য দায়ী।

ইন্টারনেট ও তথ্যের অভাব : ব্যবসার প্রসার বাড়ানোর জন্য নেটওয়ার্কিং ও সঠিক তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামাঞ্চলের অনেক নারী উদ্যোক্তার জন্য এই সুযোগ সীমিত থাকে, যা তাদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধি মন্থর করে দেয়। বিশেষত প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীরা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, যেখানে প্রায়ই তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে অনর্থক সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে এই সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়। এছাড়া অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব নারী উদ্যোক্তার সম্ভাবনাকে জটিল করে তোলে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য : ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ২০২৪-এর তথ্য বলছে, দেশে এখন শ্রমক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে শ্রমশক্তিতে যুক্ত রয়েছে ৭ কোটি ১৭ মানুষ। তার মধ্যে নারী শ্রমশক্তি ২ কোটিরও বেশি, যা মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ। কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড়ো বাধা হচ্ছে লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্য। তারা পুরুষের সঙ্গে সমান সময় দিলেও মজুরি পান অপেক্ষাকৃত কম। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য নারী উদ্যোক্তার হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা।

সম্ভাবনা

নারী উদ্যোক্তা বলতে শুধু ব্যবসায়ীদেরই বোঝায় না, বরং তারা পরিবর্তনের অগ্রদূত, উদ্ভাবক ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই; বরং দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব দেখা যাচ্ছে। তারা নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতা প্রমাণ করছে সবখানে; যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে নারীদের অবদান এখন সুস্পষ্ট। বর্তমান সমাজে প্রযুক্তি নারীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস, ফেসবুক বিজনেস পেজ, ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে নারীরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। তারা নতুন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে ঘরে বসে বিজনেস পরিচালনা করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, নারীবান্ধব নীতি এবং মাইক্রোক্রেডিট সুবিধা নারী উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

নারী উদ্যোক্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের আওতায় আনতে হবে এবং ফ্রি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের প্রথমেই লোন প্যাকেজ না দিয়ে ছোট ছোট অনুদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। সেই অনুদান হবে এককালীন এবং নারীরা ছোট আকারে তাদের উদ্যোগে সেটি কাজে লাগাতে পারবেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আরো মসৃণ করবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং ও মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নারীদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনীর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর জেলা-উপজেলায় মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। তাহলেই নারী উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা স্থাপন করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন। আধুনিক সমাজের টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী-পুরুষ সমানভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন। নারীরা উদ্ভাবনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো জোরদার হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও সংগঠক; প্রেসিডেন্ট, ফোরাম ফর পাবলিক পলিসি

nazimalmamun55@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন