কন্যাশিশু: ধর্ষকদের রুখবে কে

সিরাজুল ইসলাম

কন্যাশিশু: ধর্ষকদের রুখবে কে

তিনটি কন্যাশিশু—বয়সও কাছাকাছি, আট থেকে ১০ বছর। তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভিন্ন এলাকায়; কিন্তু পরিণতি তাদের মিলিয়েছে একই মোহনায়। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দুজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মানুষের মুখোশ পরে থাকা দুই হায়েনা। আরেকজন ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে চলেছে। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও তার মনের ক্ষত-ট্রমা যে কখনো কাটবে না, তা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

তাকে যে ধর্ষণ করেছে সেও মানুষের মুখোশ পরে থাকা পশু। তার হাতে ছিল শিশুটিকে পবিত্র কোরআন শরিফ শেখানোর দায়িত্ব। দুই শিশুর প্রাণ নেওয়া দুজন তাদের প্রতিবেশী। এ ঘটনা তিনটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের কথিত সভ্য সমাজে শিশুরা কতটা অসহায় ও নিরাপত্তাহীন। শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা স্বজন—কোথাও নিরাপদ নয় কন্যাশিশুরা!

বিজ্ঞাপন

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের দিনমজুর নজরুল ইসলামের মেয়ে রাইসা। তার মা অন্যত্র বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। বড় ভাই কাজ করেন ঢাকায় ফলের দোকানে। আর বাবা পেটের ভাত জোগাতে সারা দিন বাসায় থাকেন না। নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল ১০ বছরের শিশুটির ঘাড়ে। এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেয়েছিল প্রতিবেশী বখাটে কিশোর শিফাত। সে তাকে কুপ্রস্তাব দেয়; কিন্তু মেয়েটি রাজি হয়নি। ক্ষিপ্ত হয়ে সে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে অগ্নিদগ্ধ রাইসার একটি ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে রাইসাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমারে খারাপ জিনিস কইছে, আমি হুনি নাই দেইখা শিফাত আমার গায় আগুন দিছে।’

এ ঘটনার বিষয়ে বাবুগঞ্জ থানার ওসি শেখ মো. এহতেশামুল ইসলাম গতানুগতিক বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ঘটনার (কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শিশুটির গায়ে আগুন লাগানো) ভিডিও দেখেছি। তবে এমন অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি বা কেউ পুলিশকে জানায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রশ্ন হলো—লিখিত অভিযোগ না দিলে কি পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে না? পুলিশ লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় থাকল আর অপরাধী পালিয়ে গেল। সে যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়, তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে কীভাবে?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দিকে নজর দেওয়া যাক। ১ মার্চ দুপুরে সেখানকার ইকো পার্কে শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় আট বছরের একটি শিশু হাঁটছিল। মন্দির সংস্কারের শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা আর দেশবাসীর দোয়া ব্যর্থ করে সে পরপারে পাড়ি জমায় ২ মার্চ রাতে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ইকোপার্কে নিয়ে গিয়েছিল তার বাবার প্রতিবেশী বাবু শেখ। সিসিটিভি ফুটেজে মেয়েটির হাত ধরে তাকে ঘুরতে দেখা গেছে। ধর্ষণের সময় চিৎকার করলে শিশুটির গলায় চাকু চালিয়ে দেয় বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে।

এবার আরেকটি রোমহর্ষক ঘটনা উল্লেখ করছি। ধর্ষণের শিকার হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে) চিকিৎসা নিচ্ছে ১০ বছরের একটি মেয়ে। প্রাথমিক গাইনি পরীক্ষায় যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার কথা বলছেন চিকিৎসকরা। অভিযুক্ত মাদরাসার সুপার সাইদুর রহমানকে পুলিশ আটক করেছে। শিশুটির মায়ের ভাষ্য, তাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুরে। মেয়েটিকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার জামিলাতুন্নেছা মহিলা মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। মেয়েটি আবাসিক ছাত্রী ছিল। মাদরাসার নিচতলায় সুপার পরিবার নিয়ে থাকেন। দোতলায় শিশু শিক্ষার্থীদের রাখা হয়। ভর্তির পরই তিনি খবর পেয়েছিলেন মাদরাসায় শিশুদের নির্যাতন করা হয়। তাই দু-তিন মাস আগে মেয়ের ভর্তি বাতিল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুপারের স্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সেখানেই মেয়ে ভালো থাকবে, আর কোনো ঝামেলা হবে না।

আশ্বাস পেয়ে তিনি মেয়েকে রেখে আসেন। ১৫ মার্চ তিনি মেয়েকে আনতে যান। দেখেন মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন, পেট ফুলে গেছে। মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে চাইলে সুপারের স্ত্রী বলেন, ‘আপনার মেয়ের কিছুই হয়নি, বাড়িতে নিয়ে যান।’ পরে সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে তিনি কুষ্টিয়ায় একটি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে আলট্রাসনোগ্রাম করান। তিনি জানতে পারেন, মেয়ের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। পরে ১৬ মার্চ মেয়েটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মেয়েকে হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। মেয়েটির মায়ের ভাষ্য, সাত মাস আগে যখন মেয়েটিকে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়, তখন সেখানে ছাত্রী ছিল ৪০-৪৫ জন। এখন নেমে এসেছে আট-দশজনে। সাইদুর রহমান ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যে প্রশ্নটা সামনে চলে এসেছে, তা প্রশ্ন হলোÑশিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমে গেল কেন? বিষয়টি তদন্ত করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারের নজরদারি করা উচিত।

মৃত্যুদণ্ডও ধর্ষণ ঠেকাতে পারছে না : আমাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। পরদিন এ-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশে সই করেন রাষ্ট্রপতি। ফলে সংশোধিত আইনটি কার্যকর হয়েছে। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যুর শাস্তি প্রসঙ্গে ৯(১) ধারায় এতদিন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে ধর্ষণের পর হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছিল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে ৪৭টি ফাঁসি কার্যকর হয়। এর মধ্যে দলবদ্ধভাবে ও এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করার ঘটনায় পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় দেশের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বন্দির সংখ্যা ৩৬৫।

তাদের মধ্যে শুধু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বন্দি ১৪৪ জন পুরুষ। এরপরও ধর্ষণ থামছে না; বরং দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি এবং দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ। ২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন এবং শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি এবং ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে।

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৯১টি মামলা।

দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে : মাগুরার ছোট্ট আছিয়ার কথা মনে আছে? গত বছরের ৬ মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের মেয়েটি। ৮ মার্চ তার মা মাগুরা সদর থানায় মামলা করেন। ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়। পৈশাচিক ঘটনাটি সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। অভিযুক্ত আসামিদের বাড়িতে আগুন দেয় জনতা।

অন্তর্বর্তী সরকার অতিদ্রুত বিচার শেষ করার আশ্বাস দেয়। ১৩ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ১৭ এপ্রিল মামলাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয় এবং ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২৭ এপ্রিল মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি চলেছে। ১৩ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক এম জাহিদ হাসান রায় ঘোষণা করেন।

মেয়েটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। আছিয়া ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের বিচারের মতো অন্য ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত শেষ হোক। এসব মামলার ক্ষেত্রে অহেতুক কালক্ষেপণ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনজীবীদেরও সদিচ্ছা দেখাতে হবে। অনেক আইনজীবী মামলায় দীর্ঘসূত্রতা করতে নানা অজুহাতে সময় আবেদন করতে থাকেন। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে : ‘Justice delayed is justice denied.’ অর্থাৎ, ‘বিচার বিলম্বিত করা মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা।’ যদি কোনো আহত পক্ষের জন্য আইনি প্রতিকার বা ন্যায়সংগত প্রতিকার পাওয়া যায়, কিন্তু সময়মতো তা না আসে, তাহলে তা কার্যকরভাবে কোনো প্রতিকার না পাওয়ার সমান। শুধু রায় দিলেই হবে না, রায় কার্যকরও করতে হবে। অনেক মামলার হাইকোর্টে আপিল চলছে। সেগুলোর দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি করতে প্রয়োজনে বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। আর কন্যাশিশুদের নিরাপত্তাকে পরিবার থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...