মহীয়সী অধ্যাপক মাহমুদা বেগমকে নিয়ে

টুকরো স্মৃতি ও বিনম্র শ্রদ্ধা

অলিউল্লাহ-
অলিউল্লাহ নোমান

টুকরো স্মৃতি ও বিনম্র শ্রদ্ধা

পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মাহমুদা বেগম—মানে আমাদের খালাম্মার মৃত্যুবার্ষিকী সামনে। তিনি আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গরবিনী মা।

তাকে নিয়ে লেখার সাধ্য ও যথার্থ ভাষা আমার জানা নেই। তিনি ছিলেন একজন মহীয়সী। তিনি আমাদের সম্পাদক মহোদয়ের মতো সৎ, দেশপ্রেমিক, সততা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকা এক বিদুষী । এমন গুণী সন্তান জন্ম দেওয়া মা পৃথিবীতে কজনইবা আছেন! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সম্পাদক মহোদয়র সততা ও দেশপ্রেমে জীবনবাজি রাখার অনুপ্রেরণা তার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন । নতুবা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, বেসরকারি উদ্যোক্তা হিসেবে দেশ-বিদেশে খ্যাতিপ্রাপ্ত একজন সন্তান এ পথে পা বাড়াতে পারতেন না। মা বাধা হয়ে দাঁড়ালে সন্তানের সাধ্য নেই উপেক্ষা করে সামনে অগ্রসর হওয়ার। এ রকম মহৎ গুণের অধিকারী সন্তান জন্ম দেওয়া এক মাকে নিয়ে লিখব—এই হিম্মত আমার আসলেও নেই। তারপরও লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালের ১ জুন সম্পাদক মহোদয়কে আমার দেশ কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে ফ্যাসিবাদের পুলিশ। এরপর আমার ওপর ওই মামলা দেখাশোনার দায়িত্ব বর্তায়। সে দায়িত্ব পালনের সুবাদেই তখন নিয়মিত তাদের গুলশানের বাসায় যাতায়াত করেছি। খালাম্মার সঙ্গে ওই সময়ই সরাসরি পরিচয়। প্রায় প্রতিদিন বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে যখনই সময় পেয়েছি, দিনের ঘটনার আপডেট দিতে বাসায় গিয়েছি। সন্তানের জন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটানো একজন মাকে তখন দেখেছি একেবারে কাছ থেকেই। প্রতিদিন তিনি অধীর আগ্রহে আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন—কখন আসব এবং প্রতিদিনের আপডেট খবর জানাব। সততা ও সত্যের পথে অটল থাকতে খালাম্মা আমাকেও তখন অনুপ্রাণিত করতেন। নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন এবং নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। ২০১০ সালের আগস্টের ২৫ তারিখে আমি কারাগারে আত্মসমর্পণের আগে বাসায় গেলে খালাম্মা অশ্রুসজল চোখে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেছিলেন। তার সন্তান গ্রেপ্তার হয়েছেন, রিমান্ডে ছিলেন দিনের পর দিন; এতকিছুতেও খালাম্মাকে অটল থাকতে দেখেছি। উল্টো তখন আমাকে সাহস দিতেন। অথচ আমি যখন জেলে যাচ্ছি, তখন খালাম্মার চোখে অশ্রু দেখেছি!

আমাদের সম্পাদক মহোদয় ডিবি অফিসে রিমান্ডে। বিকালে খবর এলো তাকে ডিবি অফিস থেকে র‌্যাব নিয়ে যাবে। ভাবি ফোন দিলেন এবং বললেন দ্রুত ডিবি অফিসের সামনে আসতে। ততক্ষণে ভাবিসহ অনেকেই ডিবি অফিসের সামনে উপস্থিত হয়ে গেছেন। আমিও দ্রুত পৌঁছালাম। সন্ধ্যায় খালাম্মাও চলে এলেন। ডিবি অফিসের সামনে রাতভর আমরা পাহারা দিলাম। রাজনৈতিক নেতাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সে রাতে ডিবি অফিসের সামনে এসেছিলেন প্রতিবাদ জানাতে। গভীর রাতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। অনেকে ফেরেন ভোরের দিকে। কিন্তু খালাম্মা অটল বসে ছিলেন ডিবি অফিসের সামনের রাস্তার ফুটপাতে। ভোরে ডিবি অফিসের সামনে প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমে যায়। এ সুযোগে র‌্যাব সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ডিবি অফিস থেকে নিয়ে রওনা হয়। গাড়ির জানালার কাচ দিয়ে দেখেছেন মা ডিবি অফিসের সামনের ফুটপাতে বসে আছেন। কাকডাকা ভোরে ডিবি অফিস থেকে মায়ের সামনে দিয়ে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে যায় র‌্যাব। ঠিক এ সময় মায়ের মনটা কেমন করেছিল, সেটি তিনি ছাড়া আর কেউ অনুভব করার সাধ্য নেই। এ ঘটনা থেকে আঁচ করা যায়, ফ্যাসিবাদের এই নিপীড়ন একজন মহীয়সীকেও কতটা কষ্ট দিয়েছে।

২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সম্পাদক মহোদয়ের নির্দেশনায় তাৎক্ষণিকভাবে দেশত্যাগ করি। এরপর খালাম্মার সঙ্গে ফোনে প্রায়ই যোগাযোগ হতো। ফোনে সালাম দিলেই জিজ্ঞেস করতেন বাসায় আমার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কি না। নিয়মিত কথা হয় কি না। তিনি বলতেন, ‘সন্তানদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখবে। স্ত্রীকে ফোন দেবে নিয়মিত। নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেবে এবং দুশ্চিন্তা করো না। আল্লাহ একদিন এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন।’ ফোনে খালাম্মার এ কথাগুলো আমার কানে এখনো বাজে।

ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আগস্টের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরে এলাম। দেশে ফিরে দ্বিতীয় দিনই গুলশানের বাসায় যাই খালাম্মাকে দেখতে। তিনি আগের দিন মাত্র হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় এসেছেন। আমি বাসায় গিয়েছি জানতে পেরে দেরি না করে হুইলচেয়ারে করে বসার ঘরে এলেন। আমাকে দেখে কী যে আনন্দিত হয়েছিলেন—সেটি তার অভিব্যক্তিতেই প্রকাশ পেয়েছিল। কেমন আছি প্রশ্নের পর দ্বিতীয় প্রশ্নটাই ছিল আমার সন্তানরা কেমন আছে, কত বড় হয়েছে…এসব।

তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত নারী। সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। তার হাজারো ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন দেশজুড়ে। বিদেশেও আছেন অনেকে। সম্পাদক মহোদয় যখন কারাগারে, তখন দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই ফোন দিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। খালাম্মার ছাত্র বলে নিজেদের পরিচয় দিতেন। শিক্ষক হিসেবেও খালাম্মা অনেক গুণী ছাত্র তৈরি করে গেছেন। এটাই একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। নিজের ঘরে সুসন্তান এবং কর্মজীবনে গুণী মানুষ তৈরি করতে পারাই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সেটি তিনি করেছেন ভালোভাবেই।

মারা যাওয়ার আগে খালাম্মা মগবাজারের ইনসাফ আল-বারাকা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ব্যক্তিগত ডাক্তার আমাদের সুহৃদ মনিরুল ইসলাম ভাইকে নিয়মিত ফোন দিয়ে বিরক্ত করতাম। খালাম্মার আপডেট খবর নেওয়ার চেষ্টা করতাম। এ অবস্থায় দোয়া করা এবং খবর নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। শেষ দিনগুলোয় এবং শেষ বিদায়ে খালাম্মার খেদমতে থাকতে পারলে ভালো লাগত।

আল্লাহ, খালাম্মার ভালো কাজগুলোর প্রতিদান দেবেন আখেরাতে। দোয়া করি আল্লাহ ভুলত্রুটি ক্ষমা করে আমাদের খালাম্মাকে যেন জান্নাতের মেহমান বানিয়ে রাখেন পরকালীন জীবনে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন