মানসিক ভারসাম্যহীন রাবেয়ার বয়স ৩০ বছর। দুই মাস আগেও রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। বস্ত্রহীন অর্ধনগ্ন এই পাগলি রাস্তার পাশেই ঘুমাত। ৩৫ বছর বয়সি রোকসানা, আট মাসের গর্ভবতী অবস্থায় দিনরাত শহরের অলিগলি দিয়ে ঘুরত আর উচ্চ স্বরে গান গাইত। অনেক সময় বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকারও হতো। প্রায় ৭০ বছর বয়সি শাহজাহান পাগল ও মধ্যবয়সি মিনা পাগলির মতো অনেকের আশ্রয় এখন টাঙ্গাইলের ‘আল-মুকাদ্দাস ফাউন্ডেশনের’ আশ্রমে। ভবঘুরে এসব প্রতিবন্ধীর খুঁজে বের করে, তাদের চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন মারইয়াম মুকাদ্দাস মিস্টি। সামাজিক এ কাজের জন্য মিস্টি ইতোমধ্যে মানবিক নারী হিসেবে টাঙ্গাইলে পরিচিতি পেয়েছেন।

জানা গেছে, ছিন্নমূল প্রতিবন্ধী দেখলেই ছুটে যান তিনি। এ জন্য ঘুরে বেড়ান টাঙ্গাইলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ভারসাম্যহীন মানুষ দেখলেই তাদের পরম মমতায় কাছে টেনে নেন এই নারী।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ফুলকি ইউনিয়নের যশিহাটি গ্রামের মেয়ে মিস্টি। বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা এলাকায় বসবাস করছেন। স্কুলজীবন শেষ করে বাংলাদেশ ইয়ুথ টেকনিক্যাল ট্রেনিং কলেজ থেকে কৃষি বিভাগে অনার্স পাস করে বর্তমানে স্নাতকে অধ্যয়ন করছেন তিনি।
২০১৫ সালে নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠন ‘আল মুকাদ্দাস ফাউন্ডেশন’। এর মাধ্যমে সামাজিক ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালাতে থাকেন। ২০২১ সালে করোনাকালে সবার সহযোগিতা নিয়ে এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ টাকার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে প্রশংসা কুড়ান তিনি। এ ছাড়া শীতকালে হতদরিদ্রদের মধ্যে কম্বল বিতরণ, পথশিশুদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে ইতোমধ্যেই সংগঠনটি সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছে।

মিস্টির পরিবার জানায়, ছোটবেলা থেকেই মিস্টির ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে অসহায় বৃদ্ধদের জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু বড় হয়ে বুঝতে পারে, বৃদ্ধদের জন্য অনেক জায়গায় আশ্রম রয়েছে, কিন্তু ভবঘুরে প্রতিবন্ধীদের জন্য নেই কোনো আশ্রয়স্থল। সেই থেকে পাগলদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার প্রতি মনোযোগ দেন তিনি। ২০২৪ সালে একটি আশ্রম গড়ে তোলেন। বর্তমানে এ আশ্রমে মানসিক ভারসাম্যহীন ৩০ জন লোকের আশ্রয় হয়েছে। নিজের চেষ্টায় আর পরিবারের আয়ের টাকা দিয়ে পাগলদের চিকিৎসা, খাওয়া-থাকাসহ আশ্রম পরিচালনা করছেন তিনি। পাগলদের দেখাশোনা করতে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আল মুকাদ্দাস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মারইয়াম মুকাদ্দাস মিস্টি জানান, ‘আমি মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে, সামাজিক ও মানবিক কাজগুলো বেসরকারি উদ্যোগেও করা উচিত। সে ভাবনা থেকেই আল মুকাদ্দাস ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু। এ ছাড়া আমি উপলব্ধি করেছি, এতিম এবং বয়স্কদের জন্য আশ্রম থাকলেও পাগলদের জন্য কোনো আশ্রম নেই। এদের জন্য কেউ কাজ করে না। তাই নিজ উদ্যোগে পাগলদের আশ্রম করেছি।’ ভবঘুরে মানসিক রোগীদের জন্য ভবিষ্যতে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা রয়েছে তার, সে কথাও জানালেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

