আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভোটের মাঠে নারীর পদচারণা

এমএ আহাদ শাহীন

ভোটের মাঠে নারীর পদচারণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশে নারী রাজনীতির অবস্থান ও অগ্রগতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকার দিক থেকেও বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। সংসদের সংরক্ষিত আসনের বাইরে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও কর্মসূচি দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

ঢাকা-১০ আসনে এবি পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-১০ আসনে এবি পার্টির সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি। তিনি ঈগল প্রতীকে নির্বাচন করছেন। আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে তিনি সংবিধান, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। একজন ব্যারিস্টার হিসেবে তার প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা তাকে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জটিল সামাজিক সমস্যার আইনি দিক বিশ্লেষণে দক্ষ করে তুলেছে।

ধানমন্ডি-নিউমার্কেট-কলাবাগান-হাজারীবাগ থানার সমন্বয়ে গঠিত এ আসনটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে যানজট, বাচ্চাদের খেলার মাঠ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

একজন নারী প্রার্থী হিসেবে তিনি তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংলাপ ও গণসংযোগের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। নির্বাচনে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণসংযোগে কোনো বাধার মুখোমুখি হইনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছি। অনেকে আমার লুক, পোশাক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে অশ্লীল মন্তব্য করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম আমাদের মধ্যে পলিসি-বেসড (নীতিভিত্তিক) বিতর্ক হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ভিন্ন দলের এক প্রার্থী আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমি চাই নীতিভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিক।’

ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা

ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাসনিম জারা। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বের সামনের কাতারে থাকা তরুণদের গড়া দল এনসিপি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এছাড়া তিনি একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, জনসচেতনতা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।

সবুজবাগ (ডিএসসিসি ওয়ার্ড ১-৬ ও ৭১-৭৪), মতিঝিল (ডিএসসিসি ওয়ার্ড ৭) ও ডেমরা (ডিএসসিসি ওয়ার্ড ৭৫) নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসন। নির্বাচনি প্রচারের সময় স্থানীয় ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে তাসনিম জারা বলেন, মাঠে নেমে হেঁটে হেঁটে প্রচারের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রচার চলছে। দেশ-বিদেশে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের পরিচিতজনদের মাধ্যমে এই আসনের ভোটারদের ফুটবল প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা সচেতনভাবে একটি ক্লিন ক্যাম্পেইন করছি, যেখানে মানুষের ওপরই ভরসা করছি। মানুষ সেই জায়গায় সাড়া দিচ্ছে।’

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ প্রসঙ্গে তাসনিম জারা বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতির পরিসর কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছিল। তরুণ, নারী ও প্রবাসী অনেকেই রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছিলেন। তবে এখন আবার সেই জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে তিনি মনে করেন।

তার ভাষায়, যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমেছিল, সেই সংস্কার বাস্তবায়ন এবং অর্থ ও পেশিশক্তির বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতে চাওয়া মানুষদের জন্য একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ভোটের পরিবেশ নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি শঙ্কা আছে বলেও উল্লেখ করেন তাসনিম জারা।

সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদী লুনা

সিলেট-২ আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী তাহসিনা রুশদী লুনা ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তার স্বামী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালে গুম করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। এ ঘটনা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পর থেকে রাজনীতিতে আরো দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন তাহসিনা রুশদী লুনা। তিনি বলেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে ফ্যাসিস্ট সরকার ইলিয়াস আলীর মতো নেতাকে গুম করেছে। শুধু ইলিয়াস আলী নন, দেশের প্রায় এক হাজারের বেশি বিএনপি নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। অনেকেই ক্রসফায়ার ও হত্যার শিকার হয়েছেন।

বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে সিলেট-২ আসনটি ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় গঠিত হয়। এ আসনে গত ১৭ বছরে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি বলে মন্তব্য করেন তাহসিনা রুশদী লুনা।

তিনি বলেন, ‘ইলিয়াস আলী পাঁচ বছরে যে উন্নয়ন করেছিলেন, সেই উন্নয়নের সংস্কার বিগত ১৭ বছরে কেউ করতে পারেনি। উন্নয়নের জন্য বলতে হবে না, উন্নয়ন অবশ্যই হবে। যেখানে যা প্রয়োজন—সবকিছু পরিকল্পনা আমরা করে রেখেছি। ইতোমধ্যে আমি বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ-সিংগেরকাছ সড়কসহ ছয়টি সড়কের জন্য প্রায় ১১ কোটি টাকার অনুমোদন করে নিয়েছি। অনেক সড়কের কাজ শুরু হয়ে গেছে।’

বিএনপি উন্নয়নে বিশ্বাসী দল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের অধিকার ও উৎপাদন বাড়াতে কৃষি কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করা এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে।’

দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পেতে যাচ্ছে।’ তিনি ভোটারদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।

নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুল

নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ফারজানা শারমিন পুতুল। তার বাবা বিএনপির প্রয়াত কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুর রহমান (পটল)। তিনিও এ আসনে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন।

লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন (পুতুল) রাজশাহী বিভাগের একমাত্র দলীয় (বিএনপি) নারী প্রার্থী। তিনি বলেন, বিগত দিনের কর্মকাণ্ডে মনে হয়েছে, নারী প্রার্থী হওয়ার সুবিধাই বেশি। কারণ একজন নারী প্রার্থী হয়ে নারী ভোটারদের খুব কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছে। তারা মন খুলে কথা বলতে পারছেন। তবে কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন সমাজের কিছু কলুষিত মানুষ নীতি-নৈতিকতা ভুলে কুরুচিপূর্ণ প্রচার চালান।

ফারজানা শারমিন নারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা এই জায়গাটার পরিবর্তন করব ইনশাআল্লাহ। কিছু হীন মানসিকতার লোকজন তো সমাজে থাকবেই, জনগণই তাদের বর্জন করবে।’

ভোটারদের কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—জানতে চাইলে ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের জন্য প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে চাই। আগামী প্রজন্ম যেন দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়ে গড়ে উঠতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। এলাকার যুবকরা যেন কর্মক্ষম হয়ে নিজে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, পরিবারের কল্যাণে কাজ করে, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই; তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।’

জয়ের বিষয়ে আশাবাদী, এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমিও জনগণের পাশে আছি। জনগণ আমাকে ভোট দেবে। বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমার শতভাগ জয় নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন