ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা থেকে আপাতত সরে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই নতুন পথও স্বস্তি দিচ্ছে না উপসাগরীয় দেশগুলোকে। কারণ, নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা হলেও ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয়।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর ওয়াশিংটনের কৌশলে এই পরিবর্তন এসেছে। তেহরানকে শান্তিচুক্তির শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে এবার কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ওপর জোর দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
সোমবার নতুন এই অর্থনৈতিক অভিযান ঘোষণা করেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। এর লক্ষ্য ইরানের আয়ের অবশিষ্ট উৎসগুলো বন্ধ করা। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ব্যাসেন্ট এই নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন উদ্যোগে সহযোগিতা না করলে কোনো ব্যাংক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে না।
তবে এই কৌশল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠিন এক সমীকরণের মুখে পড়তে হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়লে হামলার শঙ্কা
উপসাগরীয় দেশগুলো এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইরান এর আগে প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই গত সপ্তাহে আরো কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার বক্তব্য, উপসাগরীয় কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে হরমুজ এখন সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের সামনে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তাদের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সুরক্ষা দেয়। আবার সেই সামরিক উপস্থিতিই তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য বানাচ্ছে।
এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমানোর চাপ বাড়ছে। কিন্তু তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও বাড়বে।
ইউএই এগিয়েছে, অন্যরা হিসাব করছে
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইতোমধ্যে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত সপ্তাহে আবুধাবি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক মিয়াদ মালেকি মনে করেন, ইউএই যদি পুরোপুরি আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে তা ইরানের জন্য এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক আঘাত হতে পারে। কারণ, ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার ক্ষেত্রে দুবাই দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস ছিল ইউএই।
তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের হিসাব ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশগুলোর তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিতে পারে তারা।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, ইরানের হামলায় গত কয়েক মাসে ইউএই ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। তাই উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউএইর অবস্থানকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার ধারণা, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান ইউএইর পথ অনুসরণ করবে না।
কাতারের জন্য হরমুজ বড় উদ্বেগ
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কায় কাতারও বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলায় এরই মধ্যে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিকল্প পথে কিছু তেল পরিবহন করা সম্ভব হলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এবং অনেক পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে তা কঠিন।
কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার আরেকটি বড় কারণ রয়েছে। দুই দেশ বিশাল একটি গ্যাসক্ষেত্র ভাগ করে নেয়। ফলে তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা দোহার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ওমান চায় কূটনীতির পথ খোলা থাকুক
ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন উদ্যোগে ওমানও খুব বেশি দূর এগোতে চাইছে না। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে দেশটি। সেই ভূমিকা ধরে রাখতে দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে ওমান।
দোহার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট রশিদ আল-মোহান্নাদ বলেন, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দেখাচ্ছে যে মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার পথে ফেরানোর চেষ্টা করছে।
সৌদি আরবও সরাসরি পথে হাঁটছে না
সৌদি আরব সাম্প্রতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগে সরাসরি যুক্ত হয়নি। তবে তেহরানের ওপর আরো কঠোর অর্থনৈতিক চাপ দেওয়ার ব্যাপারেও রিয়াদের আগ্রহ কম।
এক দশক আগে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএইর সঙ্গে ইরানবিরোধী কঠোর পদক্ষেপে যোগ দিতে দেখা যেতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদের অবস্থান বদলেছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে সৌদি আরব। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তাগত নির্ভরতা কমানোরও ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।
চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ‘মক্কা চুক্তি’ করেছে সৌদি আরব।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরানের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব দুর্বল ইরান চাইতে পারে। কিন্তু ইরান সরকারের পতনের সঙ্গে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে, সেটি রিয়াদ চায় না। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযানে যোগ দিলে ইরান বা ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’
ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে তেল ও আর্থিক খাতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এবার ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন—এই পাঁচ খাতকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে।
বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। এরই মধ্যে ইউএই, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে থাকা ৬০টি প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা খোশচেশম এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক প্রদর্শনী’ বলে মনে করেন। তার মতে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয় দেখানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির সঙ্গে নতুন উদ্যোগের তুলনা করেছেন। ওই নীতির লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তিতে রাজি করানো। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়।
চাপ বাড়ালে কী করবে তেহরান?
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি কতটা নিতে প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরো কোণঠাসা করার চেষ্টা তেহরানকে আরো আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, আত্মসমর্পণ অথবা উত্তেজনা বাড়ানোর মধ্যে ইরান সাধারণত দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা গুরুতরভাবে ইরানের অর্থনীতিতে আঘাত করলে এবারও উত্তেজনা বাড়ানোই সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এ কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন বড় এক দ্বিধা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযানে যোগ দেওয়া হয়তো নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে নিরাপদ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই পদক্ষেপই ইরানের পাল্টা হামলার পথ খুলে দিতে পারে।
ফলে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলো সম্ভবত নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর বদলে সংলাপ ও কূটনীতির পথেই জোর দেবে। তাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ইরানকে কতটা চাপে রাখা যাবে, তা নয়; বরং কীভাবে নিজেদের ভূখণ্ড ও অর্থনীতিকে এই সংঘাতের পরবর্তী ধাক্কা থেকে বাঁচানো যাবে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

