ভিন্নধারার বৈশাখ

গুলবার ফাহিম

ভিন্নধারার বৈশাখ

মঙ্গল না আনন্দ—নামের বিতর্ক এড়িয়ে ১৪৩৩ সালের বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নানারকম আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও দলীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে। বাহারি শোভাযাত্রা ও মেলার আয়োজন করেছে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। এর বাইরে রাজধানী ঢাকায় বর্ষবরণের ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে তরুণদের হাতে গড়া কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন। তাদের আয়োজনে ব্যতিক্রম ছিল চিন্তায়, স্লোগানে ও উদযাপনে। ফলে তা নজর কেড়েছে রাজধানীবাসীর। নতুন ধারার ভিন্নরকম আয়োজনে কেন উদ্যোগী হলেন তারা? প্রচলিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান থেকে তাদের আয়োজন কোথায় কতটা ভিন্ন? আগামীর বাংলাদেশে কোথায় দেখতে চান তারা এর ভবিষ্যৎ? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনটি উদ্যোগের তিন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ।

বিজ্ঞাপন

আগামী বছর আট বিভাগে নববর্ষ উদযাপন করতে চাই: আব্দুল্লাহ আল জাবের

শহীদ ওসমান হাদির হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ইনকিলাব মঞ্চ। শুরু থেকেই বাংলাদেশের কালচার নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সন্ত্রাসীর গুলিতে ওসমান হাদির শাহাদাতের পর তার বিচারদাবির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। গত বছরের মতো এবারও শাহবাগের শহীদ হাদি চত্বরে বৈশাখের আনন্দ র‌্যালি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মাটির গান আয়োজন করেছে মঞ্চ।

মঞ্চের ব্যতিক্রমী আয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, যা আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে দেখা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির নাম করে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ এমন অনেক কিছু, যা প্রকৃতপক্ষে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়, কিংবা বিভিন্ন ভিনদেশীয় সংস্কৃতিকে ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য’ নাম দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী আমলে, আমরা দেখেছি স্মৃতির নাম করে রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং জুলুমকে জাস্টিফাই করার এক ধরনের প্রবণতা। এসবের বিভিন্ন মোটিফ ও সিম্বল পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় দেখা যেত। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চ মনে করেছে, আবহমান বাংলার সংস্কৃতি-কৃষক, জেলে, কামার, কুমার ও তাঁতিদের জীবনাচরণ এবং আমাদের শৈশবের সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে বাঙালি, বাঙালি মুসলমান ও বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে জনগণের কাছে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এ কারণে ইনকিলাব মঞ্চ গতানুগতিক শোভাযাত্রার পরিবর্তে বৈশাখের আনন্দ র‍্যালি আয়োজন করেছে।

আনন্দ র‌্যালিতে আমরা আবহমান বাংলার বিভিন্ন উপকরণ, যেমন পালকি, পাতিল, সরা; বিভিন্ন পেশার উপস্থাপন এবং নানা ধরনের চরিত্র তুলে ধরেছি। এছাড়া শৈশবের অনাবিল আনন্দকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু উপকরণ রাখা হয়েছিল, যেমন বিয়ারিং গাড়ি, দুই টাকার আইসক্রিম, নারকেল পাতার তৈরি চশমা, ঘড়ি ইত্যাদি। আমরা উপস্থাপন করেছি আবহমান বাংলার খাবার মুড়ি, মুড়কি ও বাতাসা। এছাড়া বাংলার জনমানুষের বিভিন্ন পেশার প্রতীক, যেমন লাঙল, পালকি, জাল ইত্যাদি। বাংলার মানুষ ফসল তোলা এবং নতুন বছর শুরুর সময় যেসব কাজ করত, সেগুলোকেও এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির পরিবর্তে বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করার যে প্রচেষ্টা, তা ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই।

আমরা পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী থিম সং দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করি: ফয়েজ আলম

বাঙালমেল, কাব্যস্বর, বুকওয়ার্ম, চারবাক ও জনসংস্কৃতি—এ পাঁচ সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উদ্‌যাপন করা হয় বাংলা নতুন বছর। উদ্যোগের আহ্বায়ক কবি ও চিন্তক ফয়েজ আলম জানিয়েছেন ব্যতিক্রমী আয়োজনের গোড়ার কথা—‘আমরা আলাদা করে বৈশাখী আয়োজন করছি, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়; বরং বলব আমরা বাংলাদেশের জনমানুষের বৈশাখী সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী মূলধারাটাকে সামনে আনছি, যেটা শত শত বছর ধরে জনমানুষের বাস্তব জীবনাচারের ভেতর থেকে গড়ে উঠেছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ভূখণ্ডের মানুষের ভাষা, জীবনযাপন, আচার—সব মিলিয়েই একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়েছে, যেখানে সুলতানি আমলসহ বিভিন্ন সময়ের সামাজিক মিশ্রণ বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের জনজীবনে পহেলা বৈশাখ ছিল হালখাতা, মেলা, রাতে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে বাউল-মুর্শিদি গানের আসর বসানো, কিস্‌সার আসর—এসব। এই ছিল বাঙালির আবহমান পহেলা বৈশাখ। আমাদের আয়োজন সেই ধারাবাহিকতারই প্রকাশ। গত দু-তিন দশকের ঢাকার বৈশাখী আয়োজন একটা বানোয়াট সাংস্কৃতিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে আমাদের আয়োজনকে আলাদা মনে হয়। আমাদের বৈশাখী আয়োজন কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত একটা চর্চা।

আমাদের আয়োজনে নতুনত্ব আছে বলা যাবে না; কারণ আমরা তো শত শত বছরের ঐতিহ্যের বৈশাখ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে গত কয় দশকে নগরকেন্দ্রিক যে বানোয়াট বৈশাখী সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে প্যাঁচা, ময়ূর ও ত্রিশূলের মিছিলের মধ্যে—তা থেকে আমাদের আয়োজন অবশ্যই ভিন্ন। আমরা পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই’ থিম সং দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করি। এটি মূলত কৃষিজীবী জনসমাজের জীবিকাকেন্দ্রিক গান। এরপর পান্তা-আলুভর্তা-খেলনা-বাতাসা দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখি। এগুলো হলো জনমানুষের শেকড়ের ভেতর থাকা সংস্কৃতিকে সামনে আনার চেষ্টা।

আমাদের লক্ষ্য এই উদ্যোগকে এমন এক সাংস্কৃতিক চর্চায় রূপ দেওয়া, যা প্রকৃত অর্থেই সর্বজনীন হয়ে উঠবে। আমরা চাই পহেলা বৈশাখে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সব মানুষ যেন এদেশের ঐতিহ্যিক বৈশাখী আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে। আমরা যে ‘ডমিন্যান্ট কালচারাল হেজিমনি’র কথা বলছি, সেটার মোকাবিলার পদ্ধতিও এখানেই—বিকল্প কোনো কৃত্রিম ধারা দাঁড় করানো নয়, বরং মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও দেশীয় চর্চাকে শক্তিশালী করে তোলা।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতেই এ আয়োজন: মুহিব খান

জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (জাসাক) প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বছর হতে চলেছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশের শিকড়বর্তী সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরই জাসাক আয়োজন করেছিল ব্যতিক্রমী পহেলা বৈশাখ। এবার তাদের আয়োজন ছিল আরো বড় পরিসরে, আরো ভিন্নধর্মীভাবে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাসাকের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কবি মুহিব খান। তিনি জানিয়েছেন ব্যতিক্রমী আয়োজনের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎচিন্তা, শহীদদের রক্তস্নাত বাংলা ভাষা এবং বাংলা বর্ণমালার মতো বাংলা নববর্ষও বাঙালির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও জাতীয় গৌরব, যা পৃথিবীর সব জাতির নেই। এই নববর্ষকেন্দ্রিক কোনো উদ্যোগ বা আয়োজনের নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা বলয় নেই। এটি হজ ওমরা নামাজের মতো কোনো ইবাদত নয় যে সবার এক কেবলামুখী হতে হবে বা এক সীমানায় এক তরিকায় চক্কর খেতে হবে। এটি আমাদের একান্ত জাতিগত সংস্কৃতি এবং বৃহৎ পরিসরে বাঙালির আঞ্চলিক আচার-আয়োজন।

গত বছর থেকে আমরা এ আয়োজনটি আরম্ভ করি। এ বছর ‘নববর্ষের প্রার্থনা’ শিরোনামে একটি থিম সং আমরা তৈরি ও রিলিজ করেছি, যা স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতার প্রকাশ এবং নতুন বছরের যাবতীয় কল্যাণ কামনায় শোভিত। আমরা বর্ণাঢ্য বাংলা নবযাত্রায় কোনো প্রাণিমূর্তি বা রঙ্গাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক মুখোশ ব্যবহার করিনি। স্থান দিইনি কোনো অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অশালীনতা; বরং ঐতিহাসিক কাল থেকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক লাঙল, কোদাল, হালখাতা, হারিকেন, কুপিবাতি, মই, কলস, দোয়াত-কলমসহ বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সম্ভ্রান্ত রমণীদের আভিজাত্যের বাহন পর্দাঘেরা রিকশা ও পালকি প্রদর্শন করেছি। বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছি হাজার বছর ধরে এই জাতির ঘরে ঘরে ছড়িয়ে থাকা প্রাণের চেয়েও আপন সংস্কৃতির প্রতীক জায়নামাজ, তাসবিহ, কোরআনের রেহাল এবং এই ভূখণ্ড ও জনপদের স্মারকচিহ্ন মসজিদের উঁচু মিনার।

জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের এ দিনব্যাপী আয়োজনের বিশেষ পর্বে আমরা রেখেছি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মেজবান, যাতে দেশি চালের ভাতের সঙ্গে দেশি গরুর গোশত, দেশি শাকসবজি মিষ্টান্ন ও বাহারি পান পরিবেশন করা হয়েছে। শেষ পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়েছে বাঙালির আত্মার সুধা কোরআনের মিষ্টিমধুর তেলাওয়াত, বাংলার গ্রামগঞ্জ, শহর-নগর, কৃষকের উঠান ও খেয়াঘাট থেকে ইতিহাস বেয়ে উঠে আসা বিশ্বাস ও ভক্তিমাখা আল্লাহ-নবীর গান, দেশ-মাটি-মানুষের গান এবং আবৃত্তি, আলোচনা ও নাট্যানুষ্ঠান। এ সবকিছুই জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজনকে ব্যতিক্রমী, বিশুদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...