মডেল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন নিয়ে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন

ওমর শাহেদ

মডেল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন নিয়ে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশে একটি সংকটকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন এগিয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ শুরু করে।

এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ১ জানুয়ারি থেকে পূর্ণাঙ্গ আকারে শুরু হয়। এসব কার্যক্রমে বেতনভুক্ত ৭০ জন ভলান্টিয়ার আছেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছেন তারা। এই ৭০ জন ভলান্টিয়ারের সবাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী। তারা টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট, হাকিম চত্বর, রোকেয়া হলের পাশে ট্রাফিক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, পহেলা বৈশাখ প্রভৃতি দিবসগুলো ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছেন গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। আজিমপুরে তারা গড়ে তুলেছেন শহীদ মীর মাহবুবুর রহমান মুগ্ধ স্মৃতি পাঠাগার। এখানে স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীরা স্বল্পমূল্যে পড়ালেখা করতে পারেন। এই গ্রন্থাগারটি চারতলা। তারা খুব নিরিবিলি পরিবেশে পড়তে পারেন; চাকরির পড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া এবং ব্যক্তিগত পড়ালেখা সবই সম্ভব হয় এখানে।

বিজ্ঞাপন

এই ফাউন্ডেশনের ২১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি আছে। কমিটিতে আছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, ছাত্রছাত্রী ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান বা সভাপতি কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জাকারিয়া পিএসসি, জি। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ খালিদ হোসেন। তাদের প্রধান কার্যালয় ১৯২/বি, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, ঢাকা। এই সংগঠন তিনটি স্তরে কাজ করে—স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি স্তরে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক ও দিবস-ভিত্তিক কাজ করে। মধ্যমেয়াদি স্তরটি এখনো শুরু হয়নি। তাতে পোশাক পরা রিকশাচালক থাকবে, তারা নির্ধারিত ভাড়ায় চলাফেরা করবেন। বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কাজ শুরু করবে সংগঠনটি এবং নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করবে। দীর্ঘমেয়াদি স্তরে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহন পরিচালনা করার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালনে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন সদা তৎপর থাকবে।

এই সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, তরুণ কর্মশক্তিকে কাজে লাগানো। দেশের তরুণ কর্মশক্তির একটি অংশ নানাভাবে তাদের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে থাকে। ফাউন্ডেশন এই অপচয় রোধ করে তরুণ কর্মশক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে চায়; তরুণ কর্মশক্তিকে যথাযথ কাজে ব্যবহার করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। এজন্য তারা কাজ করে চলেছেন। তাদের নিয়মিত ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি উৎসব ও দিবসভিত্তিক ১৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। বিভিন্ন উৎসব ও জাতীয় দিবসে অতিরিক্ত এই স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেন।

প্রতিজন ভলান্টিয়ার প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। চারটি শিফটে এখন কাজ করছেন তারা। মাসে জনপ্রতি আট হাজার টাকা সম্মানি পান। তাদের এই কাজ শেষে তারা সার্টিফিকেট পাবেন। কাজের পাশাপাশি গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পাওয়া টাকা দিয়ে প্রতিটি ছাত্র বা ছাত্রী স্বেচ্ছাসেবক স্বচ্ছন্দে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করতে পারছেন। ভবিষ্যতে বৃহৎ কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করলে তাদের এই কাজ একটি বড় অভিজ্ঞতা হিসেবে পরিগণিত হবে।

সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ চলে। দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয় তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক চুক্তি রয়েছে। এছাড়া এই সংগঠন বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমতিপ্রাপ্ত।

মডেল ক্যান্টিন করা এই সংগঠনের লক্ষ্য। এটি ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই পরিচালনা করবেন, নিজেরাই ক্যান্টিনের সব কাজ করবেন; মুনাফাবিহীনভাবে ক্যান্টিন পরিচালিত হবে। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ও স্বল্পমূল্যে ক্যান্টিনের খাবার গ্রহণ করবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যান চলাচল সুবিধাজনক করতে গিয়ে ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জনগণের বিপুল সাড়া পেয়েছেন। বিশেষ অভিজ্ঞতা হলো ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে গিয়ে রিকশাচালক ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা তাদের সহায়তা করেন। ধীরে ধীরে সবাই সচেতন হচ্ছেন। এই সংগঠন অরাজনৈতিক ও অমুনাফাভোগী সংগঠন।

গ্রিন ফিউচার বাংলাদেশ সংগঠনের সিইও মোহাম্মদ খালিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো গ্রিন ক্যাম্পাস, ক্লিন ক্যাম্পাস কর্মসূচির আওতায় একটি মডেল ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করা।’ তার ভাষায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই নয়, এটি হতে পারে কর্মসংস্থান, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার এক অনন্য ক্ষেত্র। সেই ভাবনা থেকেই গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের ক্যাম্পাসেই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন