রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আলোচিত জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার। সেখানে তার প্রতিটি ক্ষণ কাটে সন্তান ও স্বামীর মুখ মনে করে। সারাক্ষণ একই প্রশ্ন— কবে আবার দেখতে পাবেন তাদের? আদালতের বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও বন্দি জীবনের নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা আর পরিবারের জন্য হাহাকার তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঘটানো হত্যাকাণ্ডে আয়েশা জানে তার ফাঁসি হবে। এ নির্মম ঘটনার জন্য এখন সে অনুতপ্ত হয়ে ভাবে কী ভুলটাই না সেদিন করেছে। সে জানায়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গৃহকর্ত্রীর ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেছিল সে। সেখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এর জের ধরে শাহজাহান রোডের একটি বাসায় গৃহকর্ত্রী এবং তার স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে খুন করে।
গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে থাকা আয়েশা তার গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আয়েশার বন্দি জীবনের এমন চিত্র আমার দেশর কাছে তুলে ধরেছে বিশেষ সূত্র। বিশেষভাবে নেওয়া সাক্ষাৎকারে হত্যার দায় স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে আয়েশা।
কারাগার থেকে সংগ্রহ করা আয়েশার সঙ্গে কথোপকথন এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, আয়েশা (২০) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সলিমগঞ্জ কান্দাপাড়া মুক্তারামপুর এলাকার রবিউল ইসলামের মেয়ে। ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে কারাগারে আটক আছে সে। খুনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের জীবনের কিছু তথ্যও সে আমার দেশকে জানায়। তার বয়স যখন পনের-ষোলো তখন গার্মেন্টসে চাকরি করতে করতে রাব্বি নামে এক ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তার বাড়ি ঝালকাঠি। এক পর্যায়ে তারা দুজন বিয়ে করে সাভারের হেমায়েতপুর বাসা নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে থাকে।
বিয়ের কিছুদিন পর একটা মেয়ে বাচ্চা হওয়ার পর সে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দেয়। বাচ্চার বয়স দেড় বছর হলে সে আবার কাজ খুঁজতে থাকে এবং মোহাম্মদপুরে ভিকটিমদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ পায়। তবে সবাই জানত সে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আয়ার কাজ করে।
একদিন মোহাম্মদপুর থেকে হেমায়েতপুর আসার সময় বিহারী ক্যাম্পের ভেতরে একটি সুইচ গিয়ার (বৈদ্যুতিক পাওয়ার সিস্টেমে ব্যবহৃত যন্ত্র) পড়ে থাকতে দেখে সে। দেখতে অনেক সুন্দর সুইচ গিয়ারটি সে হাতে তুলে নিয়ে নিজের ব্যাগের মধ্যে রেখে দেয়। মোহাম্মদপুরের ওই বাসায় তিনদিন কাজ করার পর চতুর্থ দিন ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটায়।
খুনের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে আয়েশা জানায়, সেদিন ওই বাসার ম্যাডামের ব্যাগ থেকে সে দুই হাজার টাকা চুরি করেছিল। এজন্য ম্যাডাম তার সঙ্গে অনেক রাগারাগি করে এবং গালে দুটি থাপ্পড় মারে ও বলে তোর স্যার এলে আজ তোকে পুলিশে দেব। এই বলে তাকে ঘরে আটক করে রাখতে চাইলে সে ব্যাগ থেকে রাস্তা থেকে কুড়ানো সেই সুইচ গিয়ারটি বের করে। তখন ম্যাডাম তাকে ফল কাটার চাকু দিয়ে আঘাত করতে গেলে সে সুইচ গিয়ারটি দিয়ে ম্যাডামকে আঘাত করে।
ম্যাডামের চিৎকার শুনে তার মেয়ে চলে এলে তাকেও সে সুইচ গিয়ার দিয়ে আঘাত করে। এ সময় তার গায়ে রক্ত লেগে যায়। পরে সে বাথরুমে ঢুকে তাড়াহুড়ো করে হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পরিবর্তন করে ম্যাডামের মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে হেমায়েতপুরের বাসায় চলে যায়।
আয়েশার স্বামী তার হাত কাটা দেখে বাসার নিচে ফার্মেসিতে নিয়ে তার হাতে সেলাই করিয়ে তাকে বাসায় রেখে কাজে চলে যায়। দিন শেষে কাজ থেকে ফিরে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভাইরাল হওয়া ছবি স্ত্রীকে দেখিয়ে বলে, কী হয়েছিল? তখন সে স্বামীকে সবকিছু খুলে বলে। শুনে তার স্বামী তাকে ঝালকাঠি নিয়ে যায়। পরে ঝালকাঠি থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
এ সময় আয়েশা আহাজারি করতে থাকে আর বলতে থাকে সে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি নিয়ে খুব অনুতপ্ত। এটি না ঘটলে তারও একটা স্বাভাবিক জীবন থাকত। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে-দুঃখে মুক্ত জীবন অতিবাহিত করতে পারত। এখন কারা প্রকোষ্টে তার রাত-দিন কাটে স্বামী-সন্তানের মুখ মনে করে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ছয় দিনের রিমান্ড শেষে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর আয়েশা দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হলে তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।
জানা যায়, নিহত লায়লা ফিরোজের স্বামী আজিজুল ইসলাম পেশায় একজন শিক্ষক। মোহাম্মদপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আসামি আয়েশা বাদী আজিজুল ইসলামের বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত ৮ ডিসেম্বর সকাল সাতটার দিকে তিনি নিজের কর্মস্থল উত্তরায় চলে যান। কর্মস্থল থেকে তিনি স্ত্রীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরবর্তী সময়ে তিনি নিরূপায় হয়ে বেলা ১১টার সময় বাসায় ফেরত আসেন। এসে দেখেন, তার স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা রক্তাক্ত জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন।
তার মেয়ের গলার ডান দিকে কাটা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মেন গেটের দিকে পড়ে আছে। তখন মেয়ের ওই অবস্থা দেখে তাকে উদ্ধার করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মাধ্যমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহত লায়লার স্বামী আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের সিসিটিভি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই দিন সকাল ৭ টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসায় ঢোকেন আয়েশা। আর ৯টা ৩৬ মিনিটে স্কুলড্রেস পরে নির্বিঘ্নে বাসা থেকে বের হন। ওই স্কুলড্রেসটি খুন হওয়া শিক্ষার্থী নাফিসার। ঘটনায় জড়িত গৃহকর্মী আয়েশা ও তার স্বামী রাব্বি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



কঙ্গোর স্বপ্নভঙ্গ, কেইন ঝড়ে শেষ হাসি ইংল্যান্ডের