বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে পতন, দেশে সুফল মিলবে কবে

Noman
এম এ নোমান

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে পতন, দেশে সুফল মিলবে কবে
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ধস নেমেছে। জ্বালানি তেলের দাম এখন যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় নেমে এলেও বাংলাদেশে এর কোনো প্রভাব নেই। আগে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম বাড়ানো হলেও এখন কমানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং বর্ধিত দামের অজুহাতে পণ্য পরিবহন ও যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধিসহ নিত্যপণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে।

কবে নাগাদ দেশের জ্বালানি তেলের বাজার স্বাভাবিক হবে, আদৌ হবে কি না, নাকি বাড়তি দামেই বিক্রি হবে—এমন প্রশ্নের জবাব নেই সরকারের নীতিনির্ধারকসহ জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে। এ বিষয়ে খোলাসা করে কেউ কোনো তথ্যও দিতে পারছেন না। তবে দেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মজুত সন্তোষজনক বলে জানান তারা।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমানোর তাগিদ দিয়েছেন ভোক্তাসহ এই খাতের বিশেষজ্ঞরা। বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য জ্বালানি খাতকে মুনাফা অর্জনের খাত হিসেবে না দেখে সরকারকে ব্যবস্থাপক ও জোগানদাতার ভূমিকায় দেখতে চান তারা।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণার পর স্বাভাবিক হয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও সরবরাহ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগামী আগস্টে সরবরাহের চুক্তিভিত্তিক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) ১ দশমিক ২২ ডলার বা ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৫২ ডলারে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল প্রতি ব্যারেল বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার ৯০২ টাকা (এক ডলার সমান ১২২ দশমিক ৭৫ টাকা হিসাবে)। প্রতি লিটার (এক ব্যারেল সমান প্রায় ১৫৯ লিটার) অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম পড়ছে প্রায় ৫৬ টাকা।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ০২ ডলার বা ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৬৯ দশমিক ৩২ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারির পর উভয় ক্ষেত্রে এ দাম সর্বনিম্ন। যদিও গত বৃহস্পতিবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একপর্যায়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। গ্রিনিচ মান সময় ওই দিন রাত ২টার দিকে আগস্টে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৪ ডলার ৮৯ সেন্টে পৌঁছায়।

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি

জ্বালানি বিভাগ গত ১৮ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। এতে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকা দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং সরবরাহব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার কথা বলে আগের দামের তুলনায় ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, অকটেন ২০ টাকা আর পেট্রোল লিটারে ১৯ টাকা বাড়ানো হয়। জুন মাসের জন্য ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার পাঁচ টাকা বাড়িয়ে যথাক্রমেÑ১৩৫ টাকা, ১৪৫ টাকা এবং ১৪০ টাকা করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশে পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়েও নতুন করে চাপ বাড়ে।

এর আগে গত ২৪ মার্চ উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম একলাফে ৯০ টাকা বাড়ানো হয়। যুদ্ধপরিস্থিতির কথা বলে গত ৭ এপ্রিল আরেক দফায় ২৪ টাকা ৭৯ পয়সা বাড়ানো হয় এ জ্বালানির দাম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার ছিল। সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে গত ৪ মে ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে উঠে যায়। ওই সময় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বেশি দামে কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করায় গত চার মাসে জ্বালানি তেল খাতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ হয় ১২৯ টাকা। এখান থেকে সরকারের রাজস্ব বিভাগের (এনবিআর) আমদানি শুল্ক নিচ্ছে প্রায় ৩৫ টাকা। আমদানি শুল্ক বাদ দিলে প্রতি লিটার ডিজেলের আমদানি মূল্য হচ্ছে ৯৪ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১১৫ টাকায়। আমদানি শুল্ক না নিলে প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের লাভ হচ্ছে ২১ টাকা। আমদানি শুল্ক যোগ করে খরচ হিসাব করে বিপিসি এখন প্রতি লিটারে লোকসান দিচ্ছে ১৪ টাকা। তবে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে লাভ করছে বিপিসি।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে আসার পর দেশের জনগণের সুফল পেতে আরো কত সময় লাগতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিপিসির কর্মকর্তারা বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আগের মাসের ২১ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় গড় করে দাম নির্ধারণ করা হয়। গত ২১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত হিসাব করে দেখা গেছে, ওই সময়ে প্রতি লিটার ডিজেলের খরচ পড়েছে ১৫৩ টাকা ২১ পয়সা। আর অকটেন কেনা হয়েছে প্রতি লিটার ১৪৪ টাকা ৪৭ পয়সা হিসাবে। এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব বিভাগের আরোপ করা আমদানি শুল্ক রয়েছে প্রতি লিটারে প্রায় ৩৫ টাকার মতো। এসব খরচ পর্যালোচনা করে আগামী মাসে (১ জুলাই) জ্বালানি বিভাগ তেলের নতুন দাম ঘোষণা করবে।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘এখন সংসদ অধিবেশনে আছি। পরে এ নিয়ে কথা বলব।

এ বিষয়ে কথা বলতে বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে আমার দেশ। তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।

তবে জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস বা বৃদ্ধির বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সরকার দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সব ধরনের চেষ্টা করেছে। বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হয়েছে। ফলে চার মাসেই বিপিসিকে এ খাতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়।

দাম কমানোর আহ্বান ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের

আগামী মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের বর্তমান দামের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। আমার দেশকে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে এ দিয়ে একটি জ্বালানি মূল্যহার স্থিতিশীল তহবিল গঠন করা জরুরি। যাতে ভোক্তাদের ভোগান্তি দূর করা যায়। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে যাতে এ তহবিল থেকে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন