অভ্যন্তরীণ অভিবাসন : সংকটে নগর অবকাঠামো

অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন : সংকটে নগর অবকাঠামো

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ প্রক্রিয়া উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও এটি ক্রমেই এক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটে পরিণত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ জনসংখ্যার অপরিকল্পিত স্থানান্তর বা অভ্যন্তরীণ অভিবাসন (Internal Migration) প্রক্রিয়া। অপরিকল্পিতভাবে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অবিরাম প্রবাহ আমাদের শহরের অবকাঠামোর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করছে । এই বিশাল জনচাপ সামলানোর মতো আমাদের শহরগুলোর কতটুকু প্রস্তুতি আছে, সেটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছে। আবার উন্নত জীবনের আশায় অনেকে শহরে স্থায়ী হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সংকোচন, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশকে শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাসহ আরো বিভিন্ন কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। শহরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সহজ, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও বেশির ভাগ শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু সমস্যা হলো, এই জনপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আবাসন খাত, গণপরিবহন ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে শহরের অবকাঠামোগত ভঙ্গুরতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসবের মধ্যে বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন সংকট এ সমস্যার সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শহরে আসা অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের হওয়ায় তারা সাশ্রয়ী ব্যয়ে বাসস্থানের খোঁজে বস্তি বা অতি সাধারণ এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। সেসব এলাকায় থাকে না পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, থাকে না স্যানিটেশন সুবিধা এবং থাকে না নিরাপত্তার ব্যবস্থা। ফলে অমানবিকভাবে তাদের জীবনযাপন করতে হয়। রয়েছে, ছিনতাই, চুরি, মাদকব্যবসা ইত্যাদি। ঘটছে খুন-খারাবি।

বিজ্ঞাপন

মেগাসিটি হিসেবে রাজধানী ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা ইতোমধ্যেই স্থবিরতার দিকে মোড় নিয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকেও অন্য অনেক দেশের তুলনায় ঢাকা শীর্ষে রয়েছে। অথচ অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত এর জনসংখ্যা বাড়লেও সড়ক অবকাঠামো এবং উন্নত যানবাহন সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ঢাকায় ভয়াবহ যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রতিটি মানুষের কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়, যা অর্থনীতির জন্যও ব্যাপক ক্ষতিকর। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ শহরমুখী হওয়ায় শহরে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা। ফলে পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। শহরে দেখা দিচ্ছে নিত্যনতুন সমস্যা। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শুধু ঢাকা নয়, বরং প্রতিটি শহরেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এসব দিক দীর্ঘ মেয়াদে একটি বড় ধরনের পরিবেশগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।

এসব ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ এত বেশি যে, সেখানে সেবার মান ধরে রাখা চিকিৎসকদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। বস্তি এলাকায় বসবাসকারী মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বেশি থাকলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।

শহরমুখী অপরিকল্পিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে শিক্ষাব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়ছে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকের পক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

তবে এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ অভিবাসন দায়ী নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ব্যাপক ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। নগর-উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এই সংকটকে আরো তীব্র করে তুলছে।

বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অপরিকল্পিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলার জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যেমন : গ্রামীণ উন্নয়নের দিকে সরকারের মনোযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সব উন্নয়ন যদি শহরকেন্দ্রিক হয়, তাহলে অভিবাসনের চাপও শহরে বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এতে মানুষ নিজ এলাকায় থেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে। ঢাকায় দৈনন্দিন যানজট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের চাকরিজীবীদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে নগর-উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন ঘটাতে হবে। শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিতে হবে কার্যকরভাবে।

জরুরি খাত ছাড়া প্রতিটি সরকারি ও ব্যক্তিগত গাড়ি সপ্তাহে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাধ্যতামূলক একদিন করে বন্ধ রাখতে হবে। এতে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের অংশ হিসেবে বাস, রেল, নৌ ও অন্যান্য গণপরিবহনকে আধুনিক এবং সময়সাশ্রয়ী করে গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহার করে কর্মজীবী মানুষদের দূরবর্তী স্থান থেকে যাতায়াত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন চলমান জনগোষ্ঠীর এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এটি বন্ধ করা যাবে না, এটা ঠিক। কিন্তু এটিকে সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত করতে না পারলে শহরগুলো ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। তাই অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে বোঝা নয়, বরং একটি অপরিহার্য বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে এটিকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে হবে।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা), ময়মনসিংহ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: