সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা

Rokon_
মে জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা

স্একইসঙ্গে এটি বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন একমাত্র মাঝারি শক্তিধর উপকূলীয় দেশ। তবুও দীর্ঘকাল ধরে দেশটি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি। আজ সেই সত্যটি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি অপরিহার্য করিডোর। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং চীন-মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বঙ্গোপসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিসরের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। এই অবস্থান একদিকে যেমন অসাধারণ সুযোগের উৎস, অন্যদিকে তেমনি গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির উৎসও বটে। যে রাষ্ট্র এই ভূখণ্ডের কৌশলগত মূল্য বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করে, সেই রাষ্ট্রই এই বাস্তবতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। যে পারে না, সে অন্যদের খেলার মাঠে পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সামরিক শক্তির বর্তমান চিত্রটি মিশ্র। ২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বে ৪৯তম সামরিক শক্তি—দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের পরেই তৃতীয় অবস্থানে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র। সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয় সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ এবং আধাসামরিক বাহিনীসহ মোট শক্তি অনেক বেশি। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়ে আসছে; আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সৈনিক মোতায়েন রয়েছে। এই পেশাদারত্ব ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একটি বড় সম্পদ।

সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সেনাবাহিনী ৭ম, ১০ম ও ১৭তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছে, স্থলভিত্তিক বিমান প্রতিরক্ষা কোর সম্প্রসারিত করেছে এবং প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে পূর্ণ ব্রিগেডে রূপান্তরিত করেছে। চীন থেকে আধুনিক এমবিটি-২০০০ ও ভিটি-৫ লাইট ট্যাংক সংযোজিত হয়েছে। তুর্কি টিআরজি-২৩০ ও টিআরজি-৩০০ কাসিরগা মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম এবং সার্বিয়ান নোরা বি-৫২ স্ব-চালিত হাউইটজার আর্টিলারি সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। তুর্কি বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোনও সেনাবাহিনীর আর্মি অ্যাভিয়েশনে যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক অধিগ্রহণের মধ্যে রয়েছে এসওয়াই-৪০০ শর্ট রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম।

নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে টাইপ ০৫৩এইচ৩ ফ্রিগেট ও টাইপ ০৫৬ স্টেলথ করভেট সংযোজনের মাধ্যমে সারফেস ফ্লিট শক্তিশালী হয়েছে। নৌবাহিনী টাইপ ০৩৫জি মিং-ক্লাস ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন পরিচালনা করছে এবং ২০২৫ সালে আরো বড় টহল জাহাজ ও দেশীয় ফ্রিগেট নির্মাণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এসেছে সম্প্রতি। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ইতালির লিওনার্দো এসপিএ’র সঙ্গে ইউরোফাইটার টাইফুন সংগ্রহের জন্য একটি লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষর করেছে। এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তবে এই অগ্রগতির পাশে দুর্বলতার চিত্রটিও সমান বা তার বেশি স্পষ্ট। বিমানবাহিনীতে একটি গুরুতর শূন্যতা রয়েছে পুরোনো যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে—মিগ-২৯ ও চীনা এফ-৭ সিরিজের বিমান ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধবিমানের মূল অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। এই পুরোনো বিমানগুলো শুধু কার্যকারিতায় নয়, নিরাপত্তায়ও হুমকি—বারবার যান্ত্রিক ত্রুটিতে মূল্যবান পাইলটের প্রাণহানি ঘটেছে। বাংলাদেশের কাছে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পারমাণবিক অস্ত্র বা দূরপাল্লার কামান নেই। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম আমদানিকৃত এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা স্টেলথ প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। সাইবার যুদ্ধের প্রস্তুতি এখনো শৈশবকালে। একটি সমন্বিত কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন ও ইন্টেলিজেন্স (সি৪আই) ব্যবস্থার অনুপস্থিতি আন্তঃবাহিনী সমন্বয়কে দুর্বল করে রাখছে।

এই সামরিক দুর্বলতার পেছনে কেবল অর্থের অভাব নয়, রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি এবং এক প্রভাবশালী প্রতিবেশীর কৌশলগত হস্তক্ষেপ। বিগত দেড় দশকে যখনই বাংলাদেশ আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে উদ্যোগ নিয়েছে, ভারতের কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা চাপ সরবরাহকারী রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১৩ সালে চীন থেকে এয়ার ডিফেন্স রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংগ্রহের পরিকল্পনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ভারতীয় অসন্তোষের কারণে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ একটি ভারতীয় জাহাজনির্মাতার সঙ্গে ২১ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করে, যা প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে অগ্রাধিকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই সিদ্ধান্তটি সাহসী এবং সঠিক। প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় বৈচিত্র্য আনা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকিগুলো বহুমাত্রিক এবং ক্রমবর্ধমান। উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব—তিন দিক থেকেই গুরুতর চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ন্যায্যতার ভিত্তিতে হচ্ছে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী উত্তেজনা বাংলাদেশ সীমান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি করে রাখে। বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের উত্থান ঘটায় বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশ্য শত্রুভাবাপন্ন বক্তব্য বেড়েছে।

মিয়ানমার সীমান্ত আরো জরুরি সংকটের উৎস। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরাকান আর্মির তৎপরতা ও রোহিঙ্গা শরণার্থী চাপের মাধ্যমে উপচে পড়ছে। ২০১৭ সাল থেকে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ২০২৫ সালেও তীব্র রয়েছে এবং বাংলাদেশ সীমান্তে গোলাগুলি, মর্টার হামলা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের ঘটনা বারবার ঘটেছে। মিয়ানমারের যেকোনো বড় উত্থান-পতন সরাসরি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রভাব ফেলে।

বঙ্গোপসাগর নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চীন ও ভারত উভয়ই এই সাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডও সক্রিয়। বাংলাদেশের সামুদ্রিক এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় শক্তিশালী নৌবাহিনী অপরিহার্য। সমুদ্রপথে মাদক ও অস্ত্র পাচার, জলদস্যুতা এবং অবৈধ মৎস্যশিকার দমনেও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ কম নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হওয়ার ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। সাইবার আক্রমণ ও তথ্যযুদ্ধের হুমকি দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো—ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রভৃতি সাইবার হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। বাংলাদেশের সাইবার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা এখনো সামরিক আধুনিকায়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিকাশমান।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ কর্মসূচির মূল্যায়ন করা দরকার। ২০০৯ সালে চালু হওয়া এবং ২০১৭ সালে সংশোধিত এই কর্মসূচি তিনটি বাহিনীর পুনর্গঠন, জনবল বৃদ্ধি, নতুন ইউনিট গঠন, আধুনিক অস্ত্র সংযোজন এবং একটি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি ফলপ্রসূ হয়েছে—নতুন ডিভিশন গঠন, কিছু আধুনিক অস্ত্র সংযোজন এবং নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ। কিন্তু আর্থিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পরিকল্পনার অনেক কিছুই পিছিয়ে পড়েছে। এখন সময় এসেছে এই কর্মসূচিকে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করে আরো শক্তিশালী রূপ দেওয়ার। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের পথ কয়েকটি মূল স্তম্ভের উপর দাঁড় করাতে হবে।

বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন সবচেয়ে জরুরি। ইউরোফাইটার টাইফুন সংগ্রহের লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষর একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে হবে এবং পাশাপাশি জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি, জে-১০সি ও অন্যান্য আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান মূল্যায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। বায়বীয় নজরদারি ও আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, উন্নত এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘপাল্লার রাডার স্থাপন অপরিহার্য। আকাশপথ রক্ষায় বাংলাদেশকে শুধু অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না—নিজের সামর্থ্য গড়তে হবে।

নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আরো আধুনিক ফ্রিগেট, কর্ভেট এবং সাবমেরিন প্রয়োজন। সামুদ্রিক টহল বিমান ও অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। খুলনা শিপইয়ার্ড ও চট্টগ্রাম ড্রাই ডকে দেশীয় জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচি আরো ত্বরান্বিত করতে হবে। দেশে তৈরি যুদ্ধজাহাজ কেবল অর্থ সাশ্রয় করে না, এটি প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতারও প্রতীক।

সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে তিনটি স্বাধীন কোর—কেন্দ্রীয়, পূর্ব ও পশ্চিম গঠনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এফজিএম-১৪৮ জ্যাভেলিন অ্যান্টি-ট্যাংক সিস্টেম সংগ্রহের মূল্যায়ন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। ভারী আক্রমণ হেলিকপ্টার, উন্নত নাইট ভিশন সরঞ্জাম, পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং স্বয়ংক্রিয় ড্রোন স্কোয়াড্রন গঠন করা জরুরি।

আধুনিক যুদ্ধ কেবল ট্যাংক ও যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোন যুদ্ধ ও তথ্যযুদ্ধ আজকের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাইবার ডিফেন্স কমান্ড গঠন করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সিমুলেশন সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক রিকনেইসাঁস সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তথ্যযুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতে একটি কৌশলগত কমিউনিকেশন ইউনিটও অপরিহার্য।

বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ও বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মাধ্যমে হালকা অস্ত্র, ইউটিলিটি যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জাম উৎপাদন করছে। এই ভিত্তিকে আরো প্রসারিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার সময় এসেছে। ২০২৫ সালে সরকার পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্ব ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি বিশেষায়িত ডিফেন্স ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ সঠিক। প্রতিটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তরকে আবশ্যিক শর্ত করতে হবে—অস্ত্র কিনব, কিন্তু প্রযুক্তি না শিখলে চিরকাল পরনির্ভর থাকতে হবে।

প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে একটি পৃথক ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়তে হবে। ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশ চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা কৌশলগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে সঠিক পদক্ষেপ। কোনো একটি দেশের ওপর প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় অতিনির্ভরতা কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করে।

প্রতিরক্ষা বাজেটের বিষয়টিও সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। গত পাঁচ বছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়ছে, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অধীনে আধুনিকায়ন অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একটি দেশ যে কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, সেজন্য প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ বাড়ানো বিলাসিতা নয়—এটি জাতীয় অস্তিত্বের বীমা। একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনও সমান জরুরি, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে দেশের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে গবেষণা করবেন।

জাতীয় নিরাপত্তা কেবল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়, এটি একটি সমন্বিত জাতীয় প্রকল্প। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে একটি সত্যিকারের সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়তে হবে। একটি স্থায়ী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এবং সক্রিয় সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন এই সমন্বয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিরক্ষা দুর্বলতার মূল্য দেওয়ার মতো বিলাসিতা আর নেই। চারপাশের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন দ্রুতগতিতে ঘটছে। মিয়ানমারের অস্থিরতা, ভারতের আধিপত্যবাদী প্রবণতা, বঙ্গোপসাগরে মহাশক্তির প্রতিযোগিতা এবং সাইবার যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা—এসবের মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই একমাত্র কার্যকর উত্তর। যুদ্ধ চাই না, কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতিই শান্তির সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন; আর প্রতিরক্ষা শক্তিই সেই রক্ষার সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা। আজকের প্রজন্মের জন্য আমরা ভীতিপ্রদ কোনো ইতিহাস নয়, বরং সাহসিকতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ রেখে যেতে চাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন