সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ বিরোধীদলীয় এমপিদের

Md. Raquibul Haque
রকীবুল হক

সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ বিরোধীদলীয় এমপিদের
প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১ দলীয় ঐক্য। তবে শুরু থেকেই সংসদীয় এলাকার কার্যক্রমে নানা বাধা-বিঘ্ন, অবমূল্যায়ন ও সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের যে ধরনের গুরুত্ব বা অবস্থান থাকার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত বলে জানা গেছে। সরকারি দল, প্রশাসন এমনকি মন্ত্রীদের তৎপরতায় বিরোধীদলীয় এমপিদের মতামত উপেক্ষা বা অমর্যাদার শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি সরকারি নানা বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বিরোধীদলীয় এমপিদের সঙ্গে বৈষম্য ও বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে খোদ জাতীয় সংসদে অভিযোগ করা হয়েছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্যরাও এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার উন্নয়নমূলক ও অন্যান্য কাজে যথাযথ ভূমিকার সুযোগ এবং সরকারি দলের সদস্যদের মতো সমান বরাদ্দ প্রত্যাশা করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

সূত্র মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন, এনসিপির ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২ ও খেলাফত মজলিসের একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়ে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। পরে গত মে মাসে সংরক্ষিত নারী আসনে বিরোধী দলের আরো ১৩ জন সদস্য নির্বাচিত হন। এসব এমপি নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেও প্রথম থেকেই ক্ষমতাসীন দল ও স্থানীয় সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের বাধা, অসহযোগিতামূলক আচরণ ও প্রভাব বিস্তারের মুখোমুখি হয়েছেন তারা। এমনকি কিছু জায়গায় সরকারি দলের হামলারও শিকার হয়েছেন বিরোধী দলের এমপি ও তার সমর্থকরা।

নির্বাচনি এলাকায় কাজে নানা বাধা-বিঘ্ন ও সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমার এলাকায় উল্লাপাড়া কামিল মাদরাসার অ্যাডহক কমিটি নবায়ন করা হয় গত ১২ মে। কিন্তু ১৩ মে ঢাকা থেকে মন্ত্রীর সুপারিশে বিএনপির একজনকে সভাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় এমপি হিসেবে আমার মতামত ছাড়াই এ ধরনের অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, একইভাবে বিরোধী দল সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনসহ নানা কাজে স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা, সরকারি দলের লোকদের চাঁদাবাজির বিষয়গুলো নিয়ে জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় এমপিরা বেশ জটিলতায় পড়ছেন। তাছাড়া ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আমাদের সঙ্গে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। এ নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে, তবে এখনো সব সমাধান হয়নি। সরকারদলীয় এমপিরা যেখানে এক-দেড় কোটি বরাদ্দ পাচ্ছেন, সেখানে জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় এমপিদের ১০-১৫ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। মহিলা এমপিরাও বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের সমান বরাদ্দ পাওয়ার কথা।

স্থানীয় উন্নয়ন কাজের মিটিংয়ে এমপি হিসেবে তাদের সম্পৃক্ত না করার বিষয়টি গত ৮ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনে তুলে ধরেন জয়পুরহাট-১ আসনের জামায়াত এমপি মো. ফজলুর রহমান সাঈদ। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

একই দিনের অধিবেশনে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির দুজন সংসদ সদস্য। প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ও আবদুল হান্নান মাসউদ এ অভিযোগ এনে এর কারণ জানতে চান।

জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব বলেন, বিভিন্ন সংসদীয় আসনে (সরকারি ও বিরোধী উভয়ই) সংসদ সদস্যদের ডিও ও স্থানীয় চাহিদার আলোকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়। দু-একদিনের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্যরাও বরাদ্দ পেয়ে যাবেন। মন্ত্রী আসাদুল হাবিব আরো বলেন, যখন যেখানে দুর্যোগ সংঘটিত হয়, জেলা পর্যায়ে প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের কাছে বরাদ্দ দেওয়া আছে। আর টিআর, কাবিখার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা চাহিদাপত্র দেন, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, তার নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে তার মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে। এমনকি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসন তার কাজে আগের চেয়ে সহযোগিতা বাড়ালেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাছাড়া তার এলাকায় ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্টরা নানা ক্ষেত্রে চাঁদাবাজিতে জড়িত রয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন জানান, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী স্থানীয় এমপিদের যেভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তা অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে যুক্তরা নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকলেও সরকারি দলের হস্তক্ষেপে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এতে স্থানীয় এমপি হিসেবে আমরা বিব্রত হচ্ছি।

এর আগে ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন তার এলাকায় সরকারি দলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের বাধা-বিঘ্নের অভিযোগ করেছিলেন। এছাড়া জ্বালানি সংকটের সময় একটি পেট্রোল পাম্প পরিদর্শনকালে স্থানীয় বিএনপির লোকদের হাতে অবরুদ্ধ ও হামলার শিকার হন নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা। এ নিয়ে সংসদে তীব্র নিন্দা জানালে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নোয়াখালীর সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা ঘটে। তার বহরের বেশকিছু গাড়ি ভাংচুর ও নেতাকর্মীদের আহত করা হয়।

বিরোধীদলীয় এমপিদের অনেকে বলেন, বিরোধী দলে থাকলেও তারা নিজ নির্বাচিত এলাকা ও জনগণের জন্য যথাযথ ভূমিকা রাখতে চান। এক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...