মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান। শেখ হাসিনার আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন পালিয়ে আছেন ভারতে। ৮১ ব্যাচের সাবেক এই সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটি ভুয়া বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান একবার নন, বারবার আলোচনায় এসেছেন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। ১৯৮৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালানোর হুকুম দিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় এসেছিলেন।
মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের মতো এমন হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বাংলাদেশে। যারা রাষ্ট্র ও সরকারকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে ভাতা নিচ্ছেন, নানা সুবিধা বাগাচ্ছেন।
জানা গেছে, সারা দেশে মোট মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন। গাণিতিক নিয়ম অনুযায়ী বছর পার হবে, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমবে। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর এই সংখ্যা কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। দিন যতই গেছে, দেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বেড়েছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সূত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে আরো প্রায় দেড় হাজার আবেদন জমা পড়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও পড়েছে বেকায়দায়।
সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ৭৮ হাজার ৯৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রাথমিক তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে মুক্তিযোদ্ধার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয় ১৯৮৬ সালে। ওই সময় জাতীয় কমিটি এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকা প্রকাশ করে। এ পর্যন্ত আটবার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
আর জামুকা প্রতিষ্ঠার পর ছয় হাজার ৪৭৬ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়নি। জামুকায় আবেদন করা অধিকাংশই শরণার্থী মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে জামুকার পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) উপ-সচিব মোহাম্মদ উল্যাহ আমার দেশকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে শুনানি হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করেই বাদ দেওয়া হয়।’এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে মেসেজ দিলেও উত্তর দেননি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট্রের করা তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২ জন। এর মধ্যে বেসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫১ হাজার ৫২৬ এবং বিশেষ তালিকায় ছিলেন ১৯ হাজার ৩৬৬ জন। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় আরো ৮৬ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। পরে চূড়ান্ত পর্যায়ে এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে। ২০১১ সালে তালিকা সংশোধনসহ নতুন করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে আবেদন গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সময় আরো এক লাখ ৩৯ হাজার আবেদন জমা পড়ে।
সূত্র জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বলে অভিযোগ আসে জামুকায়। এ নিয়ে ২০২৪ সালে মাঠপর্যায়ে শুনানি শুরু হয়। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করায় ৭১ জনের গেজেট বাতিল করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বাতিলের আবেদন করেন ১২ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে নির্ধারিত বয়সের (১২ বছর ৬ মাস) কম হওয়ায় দুই হাজার ১১১ মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে। জামুকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ছয় হাজার ৪৭৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর ৭৮ হাজার ৯৫ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সরকার লিপিবদ্ধ করে। স্বৈরশাসক এরশাদের সময় ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের করা তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। আবার ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের তালিকা প্রকাশ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক লাখ ৩৯ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ে। হিসাবে দেখা গেছে, দিন যত গেছে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে এবং আবেদনও পড়েছে।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, মাসিক ভাতাসহ এলাকায় প্রভাব রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার আবেদন পড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে। হিসাবে দেখা গেছে, দেশে ৫৩ বছরে মুক্তিযোদ্ধা বেড়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৩৯ জন।
সূত্র জানায়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ এসেছে, সেসব অভিযোগ তদন্ত করে জামুকা। অনেকেই নিজেকে শরণার্থী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করেছেন। ওই আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ছবিও যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
জামুকা জানায়, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা ৮৯ হাজার ২৩৫ জন। গেজেট বাতিল, মুক্তিযোদ্ধা বয়সসীমা নির্ধারণসহ প্রায় ১৪ ক্যাটাগরিতে মোট মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৭১৯টি। ইতোমধ্যে নির্ধারিত বয়স (১২ বছর ৬ মাস) কম হওয়ায় দুই হাজার ১১১ জনসহ মোট ছয় হাজার ৪৭৬ মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে তদন্ত শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসাবে নিয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে দ্রুত গণশুনানির আয়োজন করা হবে। আর যারা আদালতে মামলা দায়ের করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানি করা হবে।
সূত্র জানায়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে গিয়ে আসল মুক্তিযোদ্ধা যাতে বাদ না যায়, সেদিকে সতর্ক আছে সরকার। কারণ বয়স, রাজনৈতিক বিবেচনায় বা আগ্রহ না থাকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা সরকারের কাছে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আবেদন করেননি। সেক্ষেত্রে যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তারা যাতে কোনোভাবে বাদ না পড়ে, সেদিকেও জামুকা সতর্ক বলে জানা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

