গাজায় জেইতুনে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে হাজারো লাশ, ৬২ শিশুর গণদাফন

গাজায় জেইতুনে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে হাজারো লাশ, ৬২ শিশুর গণদাফন

গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এসব লাশের অনেকগুলো প্রায় তিন বছর ধরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গাজা সিভিল ডিফেন্সের কর্মী ও স্বজনেরা কয়েক সপ্তাহ ধরে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনির লাশ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। পরে এদের গণদাফন হয়েছে। রোববার অনুষ্ঠিত এই দাফনে নিহতদের মধ্যে ৬২ থেকে ৭০ শিশু ছিল। নিহতদের বড় একটি অংশ মালকা, আরহাইম, আল-বালাউই ও সালমি পরিবারের সদস্য বলে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে।

উদ্ধার করা লাশগুলো জেইতুনের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলোর কাছ থেকে প্রথমে নেওয়া হয়। পরে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা সেগুলো গাজা সিটির শহীদ কবরস্থানে নিয়ে যান। ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো লাশ ও দেহাবশেষের জানাজা ও দাফনে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর স্বজনদের লাশ পাওয়ার মধ্যেও ছিল গভীর শোক ও স্বস্তির মিশ্র অনুভূতি।

বিজ্ঞাপন

গাজার সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজের সবচেয়ে বড় বাধা ভারী যন্ত্রপাতির সংকট। ধসে পড়া ভবনের কংক্রিট ও ধ্বংসস্তূপ সরাতে বড় আকারের খননযন্ত্র, বুলডোজার, ট্রাক ও বিশেষ অনুসন্ধান সরঞ্জাম প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে হাজারো নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সিভিল ডিফেন্সের প্রধান রায়েদ আল-দাহশান বলেন, গাজায় এখনো প্রায় ৮ হাজার মানুষের লাশ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে এসব মরদেহ প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যন্ত্রপাতি প্রবেশে বাধা থাকলে উদ্ধারকাজ আরো কয়েক বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সম্প্রতি একই ধরনের আরেকটি উদ্ধার অভিযানে গাজা সিটির একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন থেকে ৫৫ ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। ওই ভবনটি যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হয়েছিল বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৬৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯২ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা হাজারো মানুষের হিসাব যুক্ত হলে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান আজিত সুনঘাই এসব উদ্ধারকাজের দৃশ্যকে গাজার যুদ্ধের ভয়াবহতার স্মারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এখনো হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছেন এবং অনেক এলাকায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধ বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের তদন্তের জন্য ধ্বংসস্তূপ ও উদ্ধার করা দেহাবশেষের প্রমাণ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রায় তিন বছর পর স্বজনদের লাশ দাফনের সুযোগ পাওয়া গাজার মানুষের জন্য যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, তেমনি এটি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের আরেকটি নির্মম চিত্র সামনে এনেছে। একেকটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির নিচে যে কত মানুষের জীবন, পরিবার ও স্মৃতি চাপা পড়ে আছে, উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে সেই বাস্তবতাই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই ও আল-জাজিরা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন