সাক্ষাৎকার

অল্প বয়সেই পেশা চূড়ান্তের প্রয়োজন নেই

অল্প বয়সেই পেশা চূড়ান্তের প্রয়োজন নেই

বর্তমান সময়ে শুধু একাডেমিক সনদ কিংবা ভালো ফল দিয়ে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া কঠিন। দ্রুত পরিবর্তনশীল চাকরির বাজারে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং মানসিক দৃঢ়তার মতো সফট স্কিলের গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের সময় হিসেবে না দেখে নিজেকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করার সময় হিসেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এবং নৈতিকতা—সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সফল ও অর্থবহ ক্যারিয়ার। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এ আহাদ শাহীন

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

আমি মনে করি, জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিকতা—এই তিনটি বিষয় ক্যারিয়ারের ভিত্তি। শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, নিজের বিষয়কে গভীরভাবে জানতে হবে। সার্টিফিকেট একজন শিক্ষার্থীকে দরজার সামনে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করায় জ্ঞান ও যোগ্যতা। পাশাপাশি যোগাযোগ, ভাষা, প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহারের দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে সততা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও শেখার আগ্রহও জরুরি। আমি তরুণদের বলি, ডিগ্রি পরিচয় দেবে, দক্ষতা সুযোগ দেবে, আর চরিত্র সেই সুযোগ ধরে রাখার শক্তি দেবে।

শুধু ভালো ফল কি ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার জন্য যথেষ্ট?

না, কখনোই নয়। ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; এটি একজন শিক্ষার্থীর অধ্যবসায় ও একাডেমিক সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু কর্মজীবন পরীক্ষার খাতার মতো নয়। তাই ফলাফলের পাশাপাশি communication skill, critical thinking, problem-solving, leadership, teamwork, digital literacy, AI literacy, research skill ও emotional intelligence গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নৈতিকতা ও সততা। দক্ষতা মানুষকে দ্রুত ওপরে তুলতে পারে, কিন্তু চরিত্রই নির্ধারণ করে সে কত দিন সেখানে থাকতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের কোন ভুল ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে?

সবচেয়ে বড় ভুল হলো চার বছরকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। অনেকেই মনে করে, ‘আগে ডিগ্রি শেষ করি, পরে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবব।’ এটি ভুল। ক্যারিয়ার প্রথম দিন থেকেই ধীরে ধীরে নির্মাণ করতে হয়। সময় নষ্ট করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, শুধু নিজের বিভাগের বই পড়া এবং ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়াও বড় ভুল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধু ডিগ্রি অর্জনের সময় নয়; এটি নিজেকে আবিষ্কার, নির্মাণ ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সময়।

বর্তমান চাকরির বাজারে কোন দক্ষতাগুলো একজন গ্র্যাজুয়েটকে এগিয়ে রাখতে পারে?

AI ও digital literacy এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। AI-কে ভয় না পেয়ে কাজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। এর পাশাপাশি communication skill, English proficiency, problem-solving, critical thinking, leadership, teamwork, adaptability, data literacy ও research skill প্রয়োজন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার্থী যেন শুধু ‘চাকরি খোঁজার মানুষ’ না হয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে, এমন মানুষ হয়ে ওঠে।

শিক্ষার্থীরা কখন থেকে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা শুরু করবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ভালো। তবে অল্প বয়সেই নির্দিষ্ট পেশা চূড়ান্ত করার প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে জানতে হবে, নিজের আগ্রহ আবিষ্কার করতে হবে এবং নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—‘আমি কী করতে ভালোবাসি, কী ভালো পারি এবং সমাজের কোন সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে চাই?’ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই চিন্তাকে বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।

ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত?

আগ্রহ, যোগ্যতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সমাজে অবদান—এই পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত। শুধু কোন পেশায় বেশি টাকা, সেটি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সবচেয়ে সুন্দর ক্যারিয়ার হলো সেটি, যেখানে নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, ফ্রিল্যান্সিং ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব কতটা?

অত্যন্ত বেশি। শ্রেণিকক্ষ জ্ঞান দেয়, আর বাস্তব অভিজ্ঞতা সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে শেখায়। ইন্টার্নশিপ কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা বোঝায়, গবেষণা প্রশ্ন করতে ও তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখায়, আর ফ্রিল্যান্সিং দায়িত্ববোধ ও সময় ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দেয়। বিতর্ক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবাও আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ায়।

ব্যর্থতার পর তরুণরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে?

প্রথমে বুঝতে হবে—ব্যর্থতা মানেই আপনি ব্যর্থ মানুষ নন। কেন ব্যর্থ হলাম, তা বিশ্লেষণ করতে হবে; দুর্বল জায়গাগুলোয় কাজ করতে হবে এবং আবার চেষ্টা করতে হবে। পড়ে যাওয়া লজ্জার নয়, পড়ে গিয়ে আর না ওঠাটাই পরাজয়। একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা কিংবা একটি চাকরি না পাওয়া জীবনের চূড়ান্ত রায় নয়।

দীর্ঘ শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?

নিজেকে এমনভাবে তৈরি করো, যাতে সুযোগের পেছনে তোমাকে ছুটতে না হয়; বরং তোমার যোগ্যতাই সুযোগকে তোমার কাছে নিয়ে আসে। শর্টকাট খুঁজবে না। সততার সঙ্গে কাজ করো, সময়কে সম্মান করো এবং প্রতিদিন কিছু শেখো। মনে রেখো, ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য হলো—পদে বড় হওয়া এবং মানুষ হিসেবেও বড় থাকা।

একজন শিক্ষার্থী আজ থেকেই ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি নিতে চাইলে আগামী এক বছর কী করবে?

আগামী এক বছর ‘নিজেকে নির্মাণের ১২ মাস’ হিসেবে দেখতে বলব। প্রথম তিন মাস নিজের শক্তি, দুর্বলতা ও আগ্রহ চিহ্নিত করবে। পরের তিন মাসে ক্যারিয়ার অনুযায়ী একটি-দুটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করবে। তৃতীয় তিন মাসে ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, প্রকল্প, ফ্রিল্যান্সিং বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেবে। শেষ তিন মাসে CV ও LinkedIn প্রোফাইল তৈরি, পোর্টফোলিও সাজানো এবং মক ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করবে। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নিজের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। তরুণদের আমার শেষ কথা—‘স্বপ্ন দেখো, স্বপ্নকে লক্ষ্য বানাও, লক্ষ্যকে পরিকল্পনায় আনো এবং পরিকল্পনাকে পরিশ্রমে রূপ দাও। আজকের ছোট ছোট শৃঙ্খলাই আগামী দিনের বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে তৈরি করো; একদিন তোমার নিজের গল্পই অন্য কোনো তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন