হাসিনার শাসনকাল

পাঁচ জেলা থেকে ১৯ হাজার পুলিশ নিয়োগ, তদন্তে সরকার

পাঁচ জেলা থেকে ১৯ হাজার পুলিশ নিয়োগ, তদন্তে সরকার
পাঁচ জেলা থেকে ১৯ হাজার পুলিশ নিয়োগ, তদন্তে সরকার। ফাইল ছবি

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ৫ জেলা থেকে প্রায় ১৯ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে দলীয়করণ, বিরোধী দল দমনে ব্যবহার এবং আওয়ামী অধ্যুষিত জেলার প্রভাব রাখার জন্য এই বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পাওয়ার জন্য গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জে জমি কেনেন চাকরিপ্রার্থীরা। এরপর স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভয়াবহ এই জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসার পর তদন্ত শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

এই নিয়োগের মধ্যে রয়েছে ১৫ হাজার কনস্টেবল, এসআই ও এএসআই; ৩,৭০০ ইন্সপেক্টর, ৩০০ সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এর মধ্যে কিছু অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এসব নিয়োগে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ পাওয়া কনস্টেবলদের বেশিরভাগ পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) কর্মরত রয়েছেন। এসব কনস্টেবলের বিরুদ্ধে গত ১৫ বছরে বিরোধীদের মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন দমন, নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার পলাতক হাবিবুর রহমান। হাবিবুর জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয়, জেলা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়াদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তদন্ত শুরু হয়েছিল; কিন্তু তদন্তকাজে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার নতুন করে সেই তদন্ত গতিলাভ করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় প্রত্যেক জেলায় দুটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে। কমিটি দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘অনিয়ম, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে কেউ অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়ে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে প্রমাণসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সাবেক আইজিপি খোদা বকশ চৌধুরী বলেন, ‘নিয়ম ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কেউ যদি মনে করে তার বিরুদ্ধে বাহিনীতে অবিচার করা হয়েছে, তাহলে ওই সদস্য আদালতে যেতে পারেন।’

পুলিশ সূত্র জানায়, ক্ষমতা পাকাপোক্ত এবং পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করতে বিগত সরকার আওয়ামী অধ্যুষিত জেলাগুলো থেকে পুলিশ নিয়োগে প্রাধান্য দেয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় ৫টি জেলা থেকে পুলিশ বাহিনীতে সবচেয়ে বেশি জনবল নেওয়া হয়। তাদের বড় অংশই আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এছাড়া প্রভাবশালী নেতাদের ডিও লেটার (আধাসরকারি পত্র) এবং মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়েও অনেকে চাকরি পান। বিগত সময়ে মাঠ পর্যায়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে এসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। পুলিশের চেইন অব কমান্ড ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে দমনে পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে। ওই সময় যারা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, তাদের অধিকাংশেরই বাড়ি ওই পাঁচ জেলায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে যারা বিতর্কিত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই ধারা চালু রয়েছে। আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে বিগত ১৫ বছরের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্রটির বিষয়টি নিয়ে সরকার তদন্ত করছে।

সূত্র জানায়, ৫ জেলা থেকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়াদের অনেকেই বিভিন্ন জেলায় সহকারী পুলিশ সুপার ও অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার এবং থানার ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী আমলে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে এসব পুলিশ কর্মকর্তা দলদাসের মতো ভূমিকা রেখেছেন। তারা ভোটের আগেই বিরোধী দলের প্রার্থীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের ঘরছাড়া করেন। পাশাপাশি এসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, গুম, হত্যা ও নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করতে জেলা পর্যায়ে দুটি করে তদন্ত কমিটি করেছে পুলিশ। এসব কমিটিতে ডিআইজিকে প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং জেলা এসবির সদস্যরা এ কমিটিকে সহায়তা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রায় সব নথি সংগ্রহ করেছে এই তদন্ত কমিটি।

নিয়োগপ্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানার পরিবর্তে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার হয়েছে কি নাÑতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং তার পরিবার ও সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি নাÑসেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন রেঞ্জ অফিসগুলোত পাঠাবে তদন্ত কমিটি। সেখান থেকে পাঠানো হবে পুলিশ সদর দপ্তরে। এরপর প্রতিবেদন যাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

যেভাবে ঠিকানা জালিয়াতি

পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে জেলা পর্যায়ে কোটা থাকে। কোনো জেলা যাতে পিছিয়ে না থাকে, এজন্য এই কোটা ব্যবস্থা করা হয়। আবেদনে জাল কাগজ বা ভুল তথ্য দেওয়া অপরাধ বলে গণ্য হয় এবং পুলিশ তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। জেলা কোটার কারণে এক জেলা থেকে বেশি নিয়োগ দেওয়া যায় না। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দলীয় নেতাকর্মীদের আওয়ামী অধ্যুষিত ৫ জেলার বাসিন্দা বানিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের নিয়োগবিধি অনুসারে কনস্টেবল পদে নিয়োগের সব ক্ষমতা জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি)। নিয়োগের জন্য কমিটি করা হলেও কমিটির প্রধান থাকেন এসপি। প্রার্থী বাছাই, নিয়োগ ও চাকরি-পরবর্তী নাম-ঠিকানা যাচাইসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। ওই সময় নিয়োগপ্রার্থী যেটি করেছেন, তা হলো নিয়োগপ্রার্থীর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। কিন্তু তিনি চাকরি পাওয়ার জন্য ফরিদপুরে জমি কিনেছেন বা ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা বানিয়েছেন। আর এসব করা হয়েছে নিয়োগের তিন মাস বা এক বছর আগে, যাতে জেলা কোটায় চাকরিতে অগ্রাধিকার পান।

প্রভাব বেশি ওই ৫ জেলার

আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে ওই ৫ জেলার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। জুলাই বিপ্লবের সময় ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন হাবিবুর রহমান। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের চন্দ্রদিঘলিয়ায়। তাকে ঘিরে পুলিশে বড় বলয় গড়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের জন্য তার পদলেহন করতেন কর্মকর্তারা। কাকে কোন বিভাগে দায়িত্ব দিতে হবে, সেজন্য তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিপীড়নে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশীদ। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তিনিও গণঅভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন। তার স্ত্রী-কন্যা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। তার বিরুদ্ধে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।

বিরোধী দল দমনে বড় ভূমিকা ছিল সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ারও। তার বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়।

বিরোধী দল দমনে আগ্রাসী ভূমিকা নেওয়া আরেক সাবেক ডিএমপি কমিশনার এবং পরবর্তীতে আইজিপি হওয়া বেনজীর আহমেদের বাড়ি গোপালগঞ্জে। বিগত ১৫ বছরে জঙ্গি নাটকের হোতা অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের বাড়িও গোপালগঞ্জে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ছেড়ে পালানো সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন