সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ২০২৪ সালের ৪ জুলাই সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ডাকে দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও অবরোধ পালিত হয়েছে দিনটিতে। শিক্ষার্থীদের দমনে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন) সন্ত্রাসী হামলা উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অচল করে দেয় সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।
দিনব্যাপী শিক্ষার্থীরা ‘সংবিধানের মূলধারা, সুযোগের সমতা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’ ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার’ ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছ’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ও ‘দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।
২০২৪ সালের ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তবে সন্ত্রাসীদের এসব হামলায় দমানো যায়নি শিক্ষার্থীদের। সন্ত্রাসীদের দেশি-বিদেশি অস্ত্রের বিপরীতে শিক্ষার্থীরা ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে চার দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যায়। সেদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-বরিশাল, খুলনা-ঢাকা, খুলনা-যশোর ও খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে স্থবির হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচল। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করে ট্রেন থামিয়ে দেন এবং টানা দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন।
ছাত্রলীগের হুমকি ও হল ফটকে তালা
৪ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে মারমুখী অবস্থানে ছিল ছাত্রলীগ। মাস্টারদা সূর্য সেন হলে সকাল ১০টার পর মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা, যার নেতৃত্বে ছিলেন হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল্লাহ খান শৈশব। প্রায় আধা ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের ভেতরে আটকে রাখা হয়। এছাড়া বিজয় একাত্তর হল, জহুরুল হক হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল এবং জসীম উদদীন হলসহ অন্তত ২১টি হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান ও বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই রাতের ঘটনা স্মরণ করে ইমরান জোবায়েদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আন্দোলনকারীদের রুখতে ছাত্রলীগ কখনো গেটে তালা ঝুলিয়ে, কখনো হল থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
রাতভর উত্তেজনার মধ্যে অমর একুশে হল থেকে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলমকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারীরা। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, কোনো হলে হামলা হলে তারা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
বরিশালে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী হামলা
এদিন দুপুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করে। বিকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা করে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ চলাকালে ছাত্রলীগের এক নেতা মোটরসাইকেল চালিয়ে অবরোধের ভেতর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত তিনজন শিক্ষার্থী আহত হন। এর আগে উপাচার্য ও প্রক্টর এসে অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় ছিলেন।
রাজধানীসহ সারা দেশে অচলাবস্থা
ছাত্রলীগের হামলা ও হুমকির মুখেও দমে যাননি সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকার শাহবাগ মোড় থেকে শুরু করে সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেট, পল্টন ও মগবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। ফলে রাজধানীর রাজপথগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
ঢাকার বাইরেও আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করে ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দুই ঘণ্টা আটকে রাখেন, যার ফলে ঢাকা-জামালপুর রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মহাসড়ক অবরোধ করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেন। এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের জন্য বিক্ষোভ করেন। খুলনার জিরো পয়েন্টে অবরোধের ফলে ঢাকা, যশোর ও সাতক্ষীরাগামী সড়কের প্রবেশমুখগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন কর্মসূচি ঘোষণা সমন্বয়কদের
এদিন সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড় ছেড়ে যাওয়ার সময় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা। দাবি আদায়ে ৭ জুলাই (২০২৪) দেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন তারা।
কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আজ আমাদের কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। আমরা আগামীকাল শুক্রবার (৫ জুলাই ২০২৪) অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ করব এবং এই কর্মসূচি সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এরপর শনিবার (৬ জুলাই ২০২৪) বিকাল ৩টায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ মিছিল করা হবে। রোববার (৭ জুলাই ২০২৪) সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

