আবু সাঈদের বয়স ২৫। কৃষক পরিবারের এিই তরুণ তার মা-বাবার ৯ সন্তানের একজন। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন বৃত্তি নিয়ে। তার স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি করার, যে চাকরি তাকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেবে। হয়তো তার পরিবারকেও গতিশীলতা দেবে এ চাকরি। কিন্তু সরকারি চাকরির কোটায় ৩০ শতাংশ রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য। এই কোটা-ব্যবস্থা তার স্বপ্নকে অনেকখানি অসম্ভব করে তোলে।
ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশে বেকার তরুণের সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। সাঈদ এ তথ্য জানতেন। স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানে আরেকটি সংখ্যা হিসেবে যুক্ত হতে চাননি। কাজেই কোটা-ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে যে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ শুরু হয়, তাতে অন্যতম প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকায় নামেন সাঈদ।
এই আন্দোলনেরই এক বিক্ষোভ চলাকালে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে মাত্র ১৫ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাঈদ। দুই দিকে দুহাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেন পুলিশের গুলির সামনে। পুলিশের গুলিতেই সাঈদের মৃত্যু হয়।
বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোয়। সারা দেশের হাজারো শিক্ষার্থীকে টেনে রাস্তায় নামিয়ে আনে ওই ভিডিও। তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে পথে নামেন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, শিক্ষার্থীদের মা-বাবা এবং রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন এবং সশস্ত্র বাহিনীর হাতে সাঈদসহ আরো দুই শতাধিক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু ক্ষুব্ধ করে তোলে তাদের।
তাদের প্রচেষ্টা এবং যে ঝুঁকি তারা নিয়েছেন, তা বৃথা যায়নি। হাইকোর্ট কোটা-ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করে সরকারি চাকরিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের জন্য ৭ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রাখে।
তবে এত বড় পরিবর্তন আনার পরও তা অসন্তোষ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়।
হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্ত আনার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর যে সহিংসতা দেখানো হয়, তা নিয়ে আবারও আন্দোলন শুরু করে তারা। তাদের দাবি শুধু কোটা পদ্ধতির সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা যথাযথ ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের দাবি তোলেন। তারা একটি নতুন সরকার চাযন। তারা চান শেখ হাসিনার পদত্যাগ।
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশকে হতবাক করে দিয়ে আজ তাদের সেই দাবি পূরণ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন নস্যাৎ করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে একটি সামরিক বিমানে করে দেশ ছেড়ে গেছেন। এই ছাত্র-জনতার আন্দোলনই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
আবু সাঈদের মতো আদর্শবান তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ছাত্র আন্দোলন ১৫ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এক স্বৈরাচারী শাসককে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। ১৫ বছর ক্ষমতা ধরে থাকলেও মাত্র পাঁচ সপ্তাহের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি তিনি।
এই আন্দোলনের সাফল্যই প্রমাণ করে দেয়, বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের বিনিময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায় না।
[আলজাজিরার এই প্রতিবেদন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রকাশিত হয়। জেনিফার চৌধুরীর লেখা প্রতিবেদনটির অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো।]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


