নারী—তিনি একজন মা, একজন কন্যা, একজন স্ত্রী, একজন বোন; সর্বোপরি দেশ ও সমাজ গড়ার অন্যতম কারিগর। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আজ ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য ঈর্ষণীয়। অথচ যে শিক্ষাঙ্গন নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, সেখানেও আজ তাদের প্রতিকূল ও অনিরাপদ পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনেই যদি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে আর কোথায় হবে? ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস’ ধারণাটি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ও জরুরি।
নারীসংবেদনশীলতা ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা
নারীরা স্বভাবগতভাবেই শারীরিকভাবে কিছুটা সংবেদনশীল। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো তাদের এই প্রাকৃতিক চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে গড়ে ওঠেনি। কিছুদিন আগে আমার এক সহপাঠী মাসিক চলাকালে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ক্যাম্পাসে তার জন্য কোনো নিরাপদ বিশ্রামাগার ছিল না। এমনকি অধিকাংশ ক্যাম্পাসের মেডিকেল সেন্টারের অবস্থাও এতটাই নাজুক যে, সেখানে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে, মাধ্যমিক স্তরের কিশোরীদের জন্য এই সংকট আরো প্রকট, যেখানে স্যানিটেশন-ব্যবস্থার ন্যূনতম মানও নিশ্চিত করা হয়নি।
বিচারহীনতা ও অনিরাপদ ক্যাম্পাস
শিক্ষাঙ্গনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনের উদাসীনতার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ছাত্রীদের। আমার এক মেধাবী ও আত্মমর্যাদাশীল সহপাঠী ক্যাম্পাসের এক বখাটে ছাত্রের ধারাবাহিক হেনস্তার শিকার হয়েছিল। বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও সে কোনো বিচার বা নিরাপত্তা পায়নি। অবশেষে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মসম্মান রক্ষার তাগিদে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ক্যাম্পাসগুলোয় এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে হেনস্তা বা উত্ত্যক্তকরণের বিচার চাওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে ছাত্রীর মুখ ঝলসে দিয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, সেখানে বিচার চাওয়ার কারণে একজন ছাত্রীর জীবন চিরতরে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। সহপাঠীদের এমন নীরব বিদায় আর অ্যাসিড-সন্ত্রাসের এই নির্মম বাস্তবতার পর কোন মুখে আমরা শিক্ষাঙ্গনকে নিরাপদ বলব?
মা শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ
উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত মায়েদের দুর্ভোগ আরো প্রকট। কিছুদিন আগে এক সিনিয়র আপু তার ছোট শিশুকে নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে চরম বিপাকে পড়েছিলেন। শিশুকে শান্ত করার বা স্তন্যপান করানোর জন্য একটি নিরিবিলি কর্নার কিংবা ডে-কেয়ার সেন্টারও আমাদের অধিকাংশ ক্যাম্পাসে নেই। পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, নিরাপদ আবাসন এবং মা শিক্ষার্থীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তাদের মৌলিক অধিকার।
নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও মানসিক স্বাস্থ্য
শিক্ষাঙ্গনে নারীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য। ছাত্রীদের জন্য শতভাগ নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত বিশেষ বাসসেবা চালু করতে হবে, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা-যাওয়ার পথে কিংবা ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের উত্ত্যক্তকরণ বা অশালীন আচরণের শিকার হতে না হয়।
একই সঙ্গে হলের আসনসংকট দূর করে নিরাপদ আবাসন, মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার এবং হেনস্তার শিকার ছাত্রীদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক পেশাদার কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে ছাত্রীদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজন
সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপত্তা। শিক্ষকের দ্বারাও ছাত্রী যৌন হয়রানি ও অশালীন আচরণের শিকার হওয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ঘটছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসন ভুক্তভোগীকে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে। ফলে ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ও সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক নারী মুখ বুজে সব সহ্য করেন এবং বিচার চাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে নারীকে নিজের নিরাপত্তার জন্য আরো আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের জন্য কারাতে বা মার্শাল আর্টের মতো আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসনকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে স্বাধীন, কার্যকর ও সক্রিয় করতে হবে, যাতে অপরাধী শিক্ষক বা ছাত্র—যেই হোক না কেন, দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আসে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের প্রতিটি অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে পর্যাপ্ত ল্যাম্পপোস্ট ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে ভবিষ্যৎ করণীয়
এসবের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনকে প্রকৃত অর্থেই নারীবান্ধব করতে হলে ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা ও মেধা বিকাশের পথ আরো সুগম করতে হবে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি বা পাঠাগারগুলোয় ছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং নারীদের জন্য বিশেষায়িত উচ্চতর গবেষণার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেধাবী ছাত্রীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় আরো বেশি উৎসাহিত করতে বিশেষ স্কলারশিপ বা বৃত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পরিশেষে, শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। আমরা যদি আমাদের কন্যা, বোন, স্ত্রী ও মায়েদের জন্য একটি নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে না পারি, তবে সব উন্নয়নই অর্থহীন হয়ে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সচেতন ছাত্রসমাজকে এখনই এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ক্যাম্পাসগুলো হোক প্রতিটি নারীর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

