উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডিভোর্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডিভোর্স
উদ্বেগজনক-হারে-বাড়ছে-ডিভোর্স

রাজধানীর উপকণ্ঠে বসবাসকারী রুনা (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পর তার স্বামীর জীবনে অন্য এক নারীর আগমন ঘটে। এরপর শুরু হয় অভিযোগের পর অভিযোগ। অবশেষে একদিন তালাকের নোটিস এসে পৌঁছায়।

আজ রুনা ভাড়া বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবনযুদ্ধ করছেন। বড় ছেলে পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে। ছোট মেয়েটি প্রায়ই মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা কি আর কখনো আমাদের সঙ্গে থাকবে না?’

বিজ্ঞাপন

মুনির দীর্ঘদিন বিদেশে চাকরি করতেন। স্ত্রী সামিরা (ছদ্মনাম) দুই সন্তান নিয়ে দেশে থাকতেন। একাকিত্ব ও মানসিক দূরত্বের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর হয় এবং একসময় তিনি সংসার ছেড়ে চলে যান। আজ সন্তানরা দাদা-দাদির কাছে বড় হচ্ছে।

চট্টগ্রামের শামিমার (ছদ্মনাম) জীবনও ভিন্ন নয়। দীর্ঘদিন সংসার করার পর স্বামীর আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। নতুন জীবনযাপন, নতুন বন্ধু-বান্ধব এবং নতুন সম্পর্কের মধ্যে পুরোনো সংসার যেন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। একসময় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন। শামিমা এখন সেলাইয়ের কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং দেশের সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২১ সালে দেশে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় বিয়েবিচ্ছেদের হার ছিল শূন্য দশমিক ৭। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪-এ। ২০২৩ সালে এই হার কিছুটা কমে ১ দশমিক ১ হলেও সামগ্রিক প্রবণতা এখনো উদ্বেগজনক। বর্তমানে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায়ও এখন বিয়েবিচ্ছেদ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, বাল্যবিয়ে, অভিবাসন এবং সামাজিক পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রাজধানী ঢাকার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। কয়েক বছরে ঢাকায় ৫০ হাজারের বেশি বিয়েবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। একসময় রাজধানীতে গড়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে তালাকের আবেদন নিবন্ধিত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে রাজধানীতে ১৩ হাজারের বেশি তালাকের আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন করেছিলেন নারীরা। গবেষকরা বলছেন, নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নির্যাতন, অসম্মান বা অসুস্থ সম্পর্ক মেনে নিতে আগের মতো বাধ্য হচ্ছেন না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এনামুল হকের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, সহনশীলতার অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, কর্মব্যস্ততা এবং দাম্পত্য জীবনে যোগাযোগের সংকট আজ সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে। একসময় যৌথ পরিবারে দাম্পত্য কলহের সমাধানে বয়োজ্যেষ্ঠরা এগিয়ে আসতেন। এখন একক পরিবারে সেই সহায়তা কমে গেছে। ছোট ভুল বোঝাবুঝিও দ্রুত বিচ্ছেদের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। পরকীয়া, স্বামীর দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান, আর্থিক বৈষম্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সন্দেহ, অহংকার এবং মানসিক দূরত্ব অনেক সংসার ভাঙনের পেছনে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো সম্পর্ককে দুর্বল করে নতুন সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব বিচ্ছেদ নেতিবাচক নয়। পারিবারিক সহিংসতা, নির্যাতন, মাদকাসক্তি বা মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বিচ্ছেদ অনেক সময় প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সাময়িক মোহ, দায়িত্বহীনতা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে যখন একটি পরিবার ভেঙে যায়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে সন্তান ও সমাজের ওপর।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। মা-বাবার বিচ্ছেদের পর অনেক শিশু অনিরাপত্তা, মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা এবং পড়াশোনায় অমনোযোগের শিকার হয়। অনেকের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়। ভবিষ্যতে সম্পর্কের প্রতি ভয় বা অনাস্থাও জন্ম নিতে পারে।

নারীদের জন্যও এই বাস্তবতা কঠিন। দীর্ঘদিন সংসার করার পর অনেক নারী আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। আবার যারা অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে সংসার ছাড়েন, তারাও অনেক সময় নতুন সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সন্তানের বিচ্ছেদের বেদনায় ভোগেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞান গবেষণা এবং নারী উন্নয়নবিষয়ক সেমিনারে উপস্থাপিত মতামতগুলোয় বারবার উঠে এসেছে, দাম্পত্য জীবনে মানসিক স্বাস্থ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং যোগাযোগের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। পরিবারকে শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, আবেগ ও দায়িত্বের জায়গা হিসেবেও দেখতে হবে।

বিয়ের আগে ও পরে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে অনেক দাম্পত্য সংকট সমাধান সম্ভব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, একে অন্যকে সময় দেওয়া এবং মতভেদের ক্ষেত্রে সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

সন্তানের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পারিবারিক মধ্যস্থতা, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ একটি সুস্থ দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

আজ প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি সম্পর্ক রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলছি, নাকি ভাঙনের সমাজ তৈরি করছি?

সংসার শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একটি পরিবারের ভাঙন অনেক সময় কয়েকটি জীবনকে বদলে দেয়। তাই সম্পর্ক রক্ষার সংস্কৃতি, পারস্পরিক সম্মান, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণ এখন সময়ের দাবি।

কারণ একটি ভাঙা সংসারের কান্না শুধু একটি ঘরের দেয়ালে আটকে থাকে না; তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় সন্তানের ভবিষ্যতে, সমাজের ভেতরে এবং আগামী প্রজন্মের জীবনেও।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন