জুলাই বিপ্লবের অগ্নিময় রাজপথে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো এক অকুতোভয় যোদ্ধা তানজিলা আক্তার তানু। তার শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল ছয়টি বুলেট, তবু অন্যায় ও স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি তিনি। গণঅভ্যুত্থানে নারীর অসীম সাহসিকতা ও ত্যাগের সেই রক্তঝরা আখ্যান তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান
জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রধান অনুপ্রেরণা কী ছিল?
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের বুলেটের বিপরীতে আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটিই ছিল আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। সাঈদের সেই প্রসারিত দুই হাত দ্রোহের প্রতীক হয়ে আমার ভেতরের ভয় নিমেষেই দূর করে দেয়। ওই দৃশ্য এবং দিনভর শিক্ষার্থীদের ওপর চলা অমানবিক নির্যাতন দেখে আমি আর নিজেকে ঘরে আটকে রাখতে পারিনি। এরপর মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ ও ইয়ামিনের মতো শত শত তরুণের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার ঘটনা আমাকে আরো তাড়িত করে। ফলে পরিবারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই আমি রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হই।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত এবং তার পরের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
দিনটি ছিল ৪ আগস্ট। যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীর সামনে রসুলপুর আবাসিক এলাকার ১ নম্বর গেটের কাছে পুলিশের মুখোমুখি আমরা কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী মিছিলের অগ্রভাগে গিয়ে দাঁড়াই। ভেবেছিলাম, অন্তত আমাদের ওপর তারা গুলি ছুড়বে না। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। তখন পিছু হটার কোনো উপায় ছিল না। গুনে গুনে ঠিক ছয়টি গুলি এসে বিদ্ধ হয় আমার শরীরে। ষষ্ঠ গুলিটি লাগার পর চোখের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসে এবং আমি ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তখন পেছন থেকে অপরিচিত এক ভাই আমাকে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ বাসায় নিয়ে যান। এরপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালের শয্যায় আবিষ্কার করি। রাত সাড়ে ১০টার পর সহপাঠীরা আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণা আর ‘পরদিন সকালে কী হবে’—এমন চরম উদ্বেগ ও অস্থিরতায় এক মুহূর্তের জন্যও দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি।
আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা কেমন? সেই ট্রমা কতটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন?
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তী দিনগুলো আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। আমি টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত খরচ চালাতাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকা এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে পড়াতে যেতে পারিনি, ফলে আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সেই শারীরিক ও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে ওঠা ছিল এক চরম লড়াই। আজও যখন জুলাইয়ের কোনো ছবি বা ভিডিও চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনের অজান্তেই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।
একজন নারী হিসেবে মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আন্দোলনে নারীদের সাহসী অবস্থানকে কীভাবে দেখেন?

একজন নারী হিসেবে টানা দীর্ঘদিন রাজপথে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আসলে দু-চার কথায় প্রকাশ করার মতো নয়। ১৮ জুলাই আমি দলছুট হয়ে একা পড়ে গিয়েছিলাম। তখন দুর্বৃত্ত কয়েকজন ব্যাগ তল্লাশির নামে তা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং আমার দিকে ধেয়ে আসে। প্রচণ্ড ভয় পেলেও তা বুঝতে দিইনি। ব্যাগে মরিচগুঁড়ো মেশানো পানি ছিল, সেটা তাদের চোখে ছুড়ে মেরেই আমাকে আত্মরক্ষা করতে হয়। আবার ৪ আগস্ট পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে আমরা নারী শিক্ষার্থীরাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, এই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা কতটা অকুতোভয় ও সাহসী ছিল।
আপনাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের কতটুকু এই দুই বছরে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন?
জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের মন থেকে দীর্ঘদিনের ভয়ের অবসান। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা দমবন্ধ পরিবেশ ভেঙে মানুষ এখন মুক্তভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছে। তবে আমাদের মূল চেতনা ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী’। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দূর করে একটি মেধা ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যারা জীবন দিয়ে কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করে আমাদের এই নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন, তাদের পরিবারের স্থায়ী পুনর্বাসন ও আহতদের উন্নত চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। এই প্রাপ্তিগুলো আমাদের যেমন গর্বিত করে, তেমনি অপূর্ণ প্রত্যাশাগুলো আগামী দিনের পথচলায় আমাদের শক্তি জোগায়।
নতুন প্রজন্মের প্রতি আপনার বার্তা কী? আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান?
নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার বার্তা হলো, আমরা আর কখনো অন্যায় বা স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করব না। তরুণেরা প্রমাণ করেছে, তারা কেবল সাধারণ ভোটার নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি। আগামী দিনের বাংলাদেশকে আমি একটি উন্নত, মানবিক ও স্বৈরাচারমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ফারহানদের রক্তস্নাত স্বাধীনচেতা মানসিকতাই হবে এই বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। তাদের রক্তে অর্জিত এই দেশকে একটি সফল ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

