‘রাজার বানানো বন্দরহাটি মসজিদ’
ফতেহ খাঁর হত্যাকাণ্ডে জৈন্তিয়ার মুসলমানরা নাখোশ হলেন। অনুতপ্ত রাজা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে জৈন্তিয়ার মুসলমানদের জন্য রাজধানী জয়ন্তাপুরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরহাটিতে একটি বিশাল মসজিদ বানিয়ে দিলেন। ১৭৬৭ সালে নির্মাণকাজ শুরুর দুই বছরের মধ্যে মসজিদটি পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়। এরপর রাজা হজরত কাশিম শাহকে মসজিদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এই অপূর্ব স্থাপনাটি ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত জৈন্তিয়ার মুসলমানদের গৌরব হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। সেই বছরের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে মসজিদটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বারবার সংস্কারের ফলে মূল মসজিদটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়; ২০০০ সালে এর শেষ অংশটুকুও হারিয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে নতুন মসজিদ নির্মিত হলেও এটি আজও জৈন্তিয়ার প্রাচীনতম মসজিদ এবং লোকমুখে ‘রাজার বানানো বন্দরহাটি মসজিদ’ নামেই পরিচিত।
শাহজির মোকাম
জৈন্তিয়া রাজ্যের বেশ কিছু মুসলিম স্থাপনা আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হজরত শাহজির মোকাম। এই স্থাপনাটি পুরোপুরি অক্ষত আছে।

হজরত শাহজি ছিলেন হজরত কাশিম শাহের মুরিদ ও খলিফা। কাশিম শাহের মৃত্যুর পর তিনি বন্দরহাটি মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন হন। ১৭৮৬ সালে (দু-এক বছর কমবেশি) তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন জৈন্তিয়ার রাজা ছিলেন বিজয়নারায়ণ সিংহ (শাসনকাল : ১৭৮৫-১৭৮৮)। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের সম্মান করতেন।
হজরত শাহজির মৃত্যুর পর রাজা বিজয়নারায়ণ সিংহ তার কবরে নান্দনিক শৈলীতে দৃষ্টিনন্দন একটি মোকাম নির্মাণ করেন। মোকামের ভেতরে শাহজির পাশাপাশি আরো দুজন শায়িত আছেন, যারা ছিলেন তার খাদেম।
শাহজির এক কন্যাকেও এই কবরগাহের কাছেই দাফন করা হয়। মূল কবরগাহের বাইরে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির পাশেই তার কবর অবস্থিত। উভয় কবরই সুন্দরভাবে বাঁধানো, যা রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ (শাসনকাল: ১৭৯০-১৮৩২) নির্মাণ করিয়ে দেন।
হজরত কাশিম শাহর বসতবাড়ি
জৈন্তিয়ার ইসলামধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়েছিলেন হজরত কাশিম শাহ। ১৭৬৫ সালে জৈন্তিয়ায় আগমনের পর রাজা বড়গোসাঁই তাকে একটি বাড়ি এবং জমিদারি দান করেন। তিনি রাজদরবারের বিচারকের মর্যাদাও লাভ করেন। তার বসবাসের সুবিধার জন্য রাজদরবারের পাশে রাজা বড়গোসাঁই তাকে একটি বাড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন। হজরত এই বাড়িটিকে জৈন্তিয়ার মুসলমানদের তালিম-তরবিয়তের কেন্দ্রে পরিণত করেন।

বাড়িটি ছিল হজরতের বসতবাড়ি, খানকাহ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রচারের কেন্দ্র। পাশেই একটি পুরোনো মোকাম থাকায় এটি ‘মোকামবাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। রাজা বড়গোসাঁই নির্মিত মূল ঘরটি ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয় এবং ১৯১১ সালের আগুনে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ১৯২৪-২৫ সালের দিকে সিকান্দার আলী খন্দকার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নতুন ঘর নির্মাণ করেন, যা আজও টিকে আছে। পুরোনো বাড়িটি বিলুপ্ত হলেও এর ফটক এখনো অক্ষত রয়েছে; জৈন্তিয়া রাজ্যের এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদ আজ অবহেলায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে।
অজানা মোকাম
যে মোকামের কারণে হজরত কাশিম শাহের বাড়িটি ‘মোকামবাড়ি’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, সেটিও একটি মূল্যবান মুসলিম স্থাপনা। এর আকার দেখে ধারণা করা হয়, ভেতরে কয়েকজনের কবর রয়েছে। তবে তারা কারা—এ বিষয়ে জৈন্তিয়ার ইতিহাসে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া বহু তথ্যের মতো এই মোকামে শায়িত ব্যক্তিদের পরিচয়ও আজও অজানা রয়ে গেছে। গবেষকদের চেষ্টাতেও তা উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তবে রাজকীয়ভাবে নির্মিত এবং রাজদরবারের নিকটবর্তী হওয়ায় ধারণা করা যায়, এখানে শায়িত ব্যক্তিরা তৎকালীন রাজার কাছে সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।

এই মোকাম নির্মাণকারী রাজার পরিচয়ও জানা যায়নি। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি ১৭৬৫ সালে হজরত কাশিম শাহের জৈন্তিয়ায় আগমনের আগেই নির্মিত হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, জৈন্তিয়ার রাজারা মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করতেন। কাশিম শাহের মৃত্যুর পর তাকে এই মোকামের পাশে দাফন করা হবে—এটাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু তাকে সমাহিত করা হয় মোকামবাড়ির পশ্চিম পাশে কিছুটা দূরে। তবে তার কয়েকজন বংশধরকে এই মোকামের পাশেই দাফন করা হয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

