আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইসলামে রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রগঠন

আব্দুস সাত্তার সুমন

ইসলামে রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রগঠন

রাষ্ট্র তখনই মানবিক থাকে, যখন শাসন চলে নৈতিকতার আলোয়। আর নৈতিকতা যখন রাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত হয়, তখন আইন পরিণত হয় শক্তিশালীদের হাতিয়ার হিসেবে। ইসলাম রাজনীতিকে কখনোই ক্ষমতা দখলের কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং একে দেখেছে আমানত, ইবাদত এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে। কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের সামনে এমন এক রাষ্ট্রদর্শন তুলে ধরে, যেখানে শাসক নয়, সত্য মুখ্য। আর ক্ষমতা নয়, মানুষের কল্যাণই মূল লক্ষ্য। আধুনিক বিশ্বে ‘ইসলামিক রাজনীতি’ শব্দটি নানা বিতর্কে জড়ালেও, কোরআন-হাদিসের আলোকে এর সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা সময়ের দাবি।

ইসলামে ক্ষমতা মানে দায়িত্ব

বিজ্ঞাপন

ইসলামে রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতাপ্রাপ্তি নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা বলেনÑ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানতগুলো তার যোগ্যদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করার সময় ন্যায়বিচার করতে।’ (সুরা আন-নিসা : ৫৮) এখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্পষ্টভাবে আমানত বলা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।’ (বুখারি : ৮৯৩, মুসলিম : ১৮২৯) অতএব ইসলামে ক্ষমতা হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি জবাবদিহিমূলক দায়িত্ব।

ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকো, তা নিজের বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও।’ (সুরা আন-নিসা : ১৩৫) রাসুল (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে সাত শ্রেণির মানুষ; তাদের মধ্যে একজন হলো ন্যায়পরায়ণ শাসক।’ (বুখারি : ৬৬০, মুসলিম : ১০৩১)

কোরআন-হাদিসে রাষ্ট্রনায়কের চরিত্র

ইসলামে আদর্শ নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতার চেয়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় শাসক হলো ন্যায়পরায়ণ শাসক আর সবচেয়ে ঘৃণিত শাসক হলো জালিম শাসক।’ (তিরমিজি : ১৩২৯) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম : ১৪২)

খলিফা আবু বকর (রা.) দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছিলেন, ‘আমি সঠিক পথে থাকলে আমাকে সাহায্য করবে আর ভুল করলে আমাকে সংশোধন করবে। (আত-তাবারি, খণ্ড-৩) এটাই ইসলামি রাষ্ট্রনায়কত্বের মূলনীতি।

বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে ইসলামের রাষ্ট্রনীতি

ইসলাম কখনো ধর্মীয় জবরদস্তিকে সমর্থন করে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধর্ম বিষয়ে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।’ (সুরা আল-বাকারা : ২৫৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব।’ (আবু দাউদ : ৩০৫২)

মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুল (সা.) প্রমাণ করেছেন বহুধর্মীয় সমাজেও ন্যায়, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই ইসলামিক রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

ইসলামি আইন প্রয়োগের সঠিকক্রম

অনেকে মনে করেন ইসলামে রাষ্ট্র মানেই কঠোর শাস্তি। এটা ভুল ধারণা বা অপপ্রচার। বস্তুত শাস্তি সর্বশেষ ধাপ। আগে সুশিক্ষা তারপর সুশাসন আর সবশেষে দুষ্টের প্রতিকার বা শাস্তি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘শাস্তি প্রয়োগে সন্দেহ দেখা দিলে তা প্রত্যাহার করো।’ (আত-তিরমিজি : ১৪২৪, ইবনে মাজাহ : ২৫৪৫)

ইসলাম একটি রাষ্ট্রকে প্রথমে যে দিকগুলো নিশ্চিত করতে বলে তা হলো যথাক্রমে : ১. দারিদ্র্যদূরীকরণ, ২. শিক্ষা ও নৈতিকতা গঠন, ৩. স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ৪. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। এই ভিত্তি ছাড়া আইন প্রয়োগ ইসলামসম্মত নয়।

শেষ কথা হলো, ইসলামে রাজনীতির লক্ষ্য ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়। এটি একটি নৈতিক রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে শাসন আমানত, নেতৃত্ব ইবাদত এবং রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণের মাধ্যম। যে রাষ্ট্র সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদাকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়, সেই রাষ্ট্রই কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিফলন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন