কাশ্মীরের ৬০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ভোজ

কাশ্মীরের ৬০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ভোজ

পনেরো বছর বয়সে বাবার হাত ধরে প্রথম রান্নার আসরে ঢুকেছিলেন গুলাম নবী বাবা। এখন তার বয়স ৭৪। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক। হাতে মুগুর আর চোখে কাঠের আগুনের আঁচ নিয়ে তিনি আজও কাশ্মীরের বিয়েবাড়িতে রান্না করেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন তাকে প্রতিদিন খোঁচায়। তার রান্নার লিগ্যাসি তার পরে কে ধরে রাখবে?

মধ্য এশিয়া থেকে কাশ্মীরের উপত্যকায়

বিজ্ঞাপন

শরৎ আসতেই শ্রীনগরের পুরোনো শহরের উঠোনে উঠোনে শোনা যেতে থাকে একটানা ঠকঠক শব্দ। কাঠের মুগুর দিয়ে পেটানো হচ্ছে খাসির মাংস। কারো বিয়ের ভোজ আসন্ন। আর সেই ভোজের মূল আকর্ষণ বহু পদের মাংসের আয়োজন—ওয়াজওয়ান।

ওয়াজওয়ানের গল্প শুরু হয় চৌদ্দ শতকে। মধ্য এশিয়া থেকে শাসকরা তখন কাশ্মীরে এসেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন দক্ষ রাঁধুনি। তাদের সঙ্গে আরো এসেছিলেন কার্পেট ও শাল বয়নশিল্পীরা, যাদের হাতের কাজ পরে কাশ্মীরের পরিচয় হয়ে ওঠে।

মধ্য এশিয়ার সেই রাঁধুনিদেরই উত্তরসূরি ৭৪ বছর বয়সি গুলাম নবী বাবা। বাবার পূর্বপুরুষরা শ্রীনগরের পুরোনো শহরে থিতু হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে তুলেছিলেন রাঁধুনিদের একটি পাড়া—ওয়াজপোরা।

সাত থেকে বিশ পদ

শুরুতে বিয়ের ভোজের মেন্যুতে মাংসের পদ ছিল মাত্র সাতটি। বাবা বলেন, ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা আরো পদ যোগ করেছি। এখন প্রায় ২০টি পদ রান্না করা হয়।’

এই বহু পদের রান্না শুধু স্বাদের বিষয় নয়, সামাজিক মর্যাদাও প্রকাশ করে। বাবার ভাষ্য, বিয়ের আসরে খাবারের টেবিলে কত পদ পরিবেশন করা হবে আর কী পরিমাণ মাংস রান্না হবে, তা অনেক সময় পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যও প্রকাশ করে।

স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘৪০ বছর আগে উত্তর কাশ্মীরের ডেলিনা গ্রামে একটি বিয়েতে আমি ৪ হাজার ৫০০ কেজি মাংস রান্না করেছিলাম। সেটি ছিল অনেক বড় বিয়ের আয়োজন।’ সাধারণ বিয়েতে অবশ্য রান্না হয় ২০০ কেজির মতো মাংস।

হাতের পিটুনি, কাঠের আঁচ

বিয়ের ভোজে পদ বেড়েছে, কিন্তু রান্নার পদ্ধতি বদলায়নি একদমই। হালকা মসলা মেখে প্রথমে হাতে পিটিয়ে মাংস নরম করা হয়। তারপর কাঠের আগুনে চলে ধীর আঁচে রান্না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে রান্নার কাজে নামেন গুলাম নবী বাবা। সেই থেকে প্রায় ছয় দশক ধরে কাশ্মীরের বিয়ের আসরে তিনি আছেন হাতা-খুন্তি নিয়ে।

উত্তরসূরির অন্য পথ

তবে এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বাবার নিজের ঘরেই। তার ছেলে বাপ-দাদার পেশায় আসেননি, খুলেছেন একটি রেস্তোরাঁ।

আক্ষেপ নিয়ে বাবা বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্নার ঐতিহ্য ধরে রাখতে আগ্রহী না। তারা বলে, কাজটায় পরিশ্রম অনেক বেশি।’

কারণটা বোঝা কঠিন নয়। রেস্তোরাঁয় কাজের সময় তুলনামূলক বাধাধরা। অথচ বিয়ের আসরে রাঁধুনিদের প্রায় সারাক্ষণই খাটতে হয়।

তবু পেশা বদলালেও ঐতিহ্যের সূত্রটা পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়নি। রেস্তোরাঁর আধুনিক ‘কিচেনে’ গুলাম নবী বাবার ছেলে কয়েকশ বছরের পুরোনো ওয়াজওয়ান রান্নার ঐতিহ্যকে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন এক পরিসরে, নতুন একসময়ে।

রয়টার্স অবলম্বনে মারজুক আহমেদ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন