আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্থলপথে বাংলায় ইসলামের আগমন

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

ড. তাওহিদুল ইসলাম

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের শাসনামলে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করেন, তখন বাংলা পাক-ভারত উপমহাদেশে স্থলপথে ইসলামেরে আগমন ঘটে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের প্রধান কারণ ছিল, বর্তমান পাকিস্তানের দেবল বন্দরের কাছে কয়েকটি আরব জাহাজ লুণ্ঠন। এসব জাহাজে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ও পূর্বাঞ্চলের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের জন্য সিংহলের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) শাসকের পক্ষ থেকে পাঠানো মূল্যবান উপহার ছিল। যদিও মুহাম্মদ বিন কাসিমের শাসনকাল জয়কৃত অঞ্চলে মুসলিম কর্তৃত্ব বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবু তিনি এই দেশকে নতুন এক ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং ভারতের অধিবাসীর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। এ ঘটনা পরেই বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম বিস্তারের দ্বার ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করে দেয়।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের প্রভাব সরাসরি বাংলায় পৌঁছাতে পারেনি, তারপরও ইসলামের প্রভাবে পরিবর্তনের হাওয়া উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের মতো বাংলাকেও স্পর্শ করেছিল। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই অভিযানের মূলে ছিল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

বিজ্ঞাপন

এরপর গজনির সুলতান মাহমুদ গজনবী (৯৯৭-১০৩০ খ্রি.) বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে স্থলপথে ইসলামের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে তার পরিচালিত অভিযানের সঠিক সংখ্যা ও সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, তিনি ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই অঞ্চলে ১৭টি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তবে সবগুলো অভিযানে বিজয় অর্জন করলেও তিনি জয়কৃত ভূখণ্ডে স্থায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেননি।

তার অভিযানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বহু ভ্রান্ত ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। কেউ তাকে ‘প্রধান লুণ্ঠনকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, আবার কেউ তাকে ইসলামের মহান প্রচারক বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তার অভিযানের প্রকৃত প্রেরণা ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক।

সদ্য প্রতিষ্ঠিত গজনি সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করা, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, মুসলিম বিশ্বের অন্য শাসকদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা এবং ভাড়াটে সৈন্যদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া—এসব কারণেই তিনি বারবার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে সময় ভারত ছিল সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। ফলে সুলতান মাহমুদ গজনবী বহুবার ভারত আক্রমণ করে বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। ভারতে স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অভিযানের মাধ্যমে উপমহাদেশ, যার মধ্যে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, সরাসরি ইসলামের অনুসারী জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে। এর ফলে উপমহাদেশের সমাজ জীবনে গভীর প্রভাব পড়ে এবং বহু হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। নিঃসন্দেহে, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তৃতীয়ত, মুহাম্মদ ঘুরি ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে তারাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে রাজপুত নেতা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করার মাধ্যমে উপমহাদেশে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধকে ভারতের ইতিহাসে এক বাঁক বদলে দেওয়া যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে উপমহাদেশে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয়। এই বিজয়ের পর মুহাম্মদ ঘুরির প্রতিনিধি কুতুবউদ্দিন আইবেক ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধীরে ধীরে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে শাসন বিস্তার করতে থাকেন। মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্বাধীনভাবে দিল্লিতে মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন।

একই সময়ে, মুহাম্মদ ঘুরির সঙ্গে ভারতে আগত তরুণ সেনানায়ক ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০২-০৩ খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধদের দুর্গবদ্ধ বিহার (তৎকালীন মগধ) দখল করেন। তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরাজিত করেন। এই বিজয়ের ফলে বখতিয়ার খলজির সামনে বাংলা জয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়।

সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন সেন বংশের রাজা রাজা লক্ষ্মণ সেন, যার একটি রাজধানী ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায়। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজি নদিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার একাংশ দখল করেন।

মূলত বখতিয়ার খলজি ছিলেন এক ভাগ্যান্বেষী ব্যক্তি। কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ না পেয়ে তিনি অযোধ্যায় চলে আসেন এবং মালিক হুসামউদ্দিনের অধীনে মির্জাপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের দুটি পরগনা বা গ্রাম (ভুইলি ও ভাগবত) জায়গির হিসেবে লাভ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী রাজ্যগুলো আক্রমণ করে ধনসম্পদ আহরণ করা এবং উন্নত ভাগ্যের সন্ধানে ভারতে আগত দুঃসাহসী খলজি আমিরদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলা।

অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তুর্কি বীরদের একটি দল নিজের অধীনে সংগঠিত করে শক্তি সঞ্চয় করেন এবং ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো জয় করে শেষ পর্যন্ত বাংলাও অধিকার করেন। অতএব বলা যায়, বখতিয়ার খলজির অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে, বাংলা ও আরবের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। এর প্রমাণ পাওয়া যায় এ ঘটনায় যে, বখতিয়ার মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে নদিয়ার রাজপ্রাসাদের ফটকে উপস্থিত হলে প্রহরীরা তাদের মুসলমান ঘোড়া ব্যবসায়ী বলে মনে করে কোনো প্রতিরোধ করেনি। এতে স্পষ্ট হয়, বখতিয়ারের অভিযানের বহু আগেই আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে আগত বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলার অভ্যন্তরীণ নগরগুলোয় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এভাবে বাণিজ্যিক যোগাযোগই বাংলায় মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিজয়ের পথ সুগম করেছিল।

এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় বহু সুফি-সাধক ও ধর্মপ্রচারক বাংলায় আসেন এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ প্রচার করেন। বাংলায় আগত প্রাথমিক যুগের সুফি-সাধকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—মুন্সীগঞ্জ জেলার বাবা আদম শহীদ, নেত্রকোনার মদনপুরের শাহ মোহাম্মদ সুলতান রুমি, বগুড়ার মহাস্থানগড়ের শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার এবং পাবনার শাহবাজপুরের মখদুম শাহ দৌলা শহীদ।

তাদের আগমনের সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা অত্যন্ত দুরূহ। তবে সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎসের আলোকে আধুনিক গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, সামরিক অভিযানের আগেই তাদের বাংলায় আগমন ঘটেছিল।

শেষকথা

ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই আরব বিশ্বের সঙ্গে বাংলা পাক-ভারত উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয়—যার মধ্যে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত, সুদৃঢ় ও নিয়মতান্ত্রিক বাণিজ্য-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই সম্পর্ক শুধু পণ্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর মাধ্যমে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব মুসলমানরা পশ্চিম ভূমধ্যসাগর, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন। এর ফলে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরো সম্প্রসারিত হয়ে বাংলার অভ্যন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যায় এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

তৎকালীন আরব মুসলমানদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা যেখানে যেতেন, সেখানেই ইসলামের বার্তা ও আদর্শ বহন করে নিয়ে যেতেন। ফলে শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আরব বণিকরা বাংলায় আগমন করেননি, বরং ইসলামের ধর্মীয় বাণী প্রচার ছিল তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। সে সময় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ নতুন ধর্মের বিস্তারের জন্য যথেষ্ট অনুকূল ছিল। মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের আদর্শে প্রভাবিত হয়ে তখন বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছিল।

অন্যদিকে, মুসলমান সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান ও স্থলপথে জয়ও মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কারণ দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। যদিও বহু ধর্মপ্রচারক ও সুফি-সাধক উপমহাদেশে এসে ইসলামের বাণী প্রচার করেন এবং তাদের মাধ্যমেই অধিকসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তবু স্বীকার করতে হয় যে, বাংলায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারে বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগই সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং তার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগের ওপর গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবির্ভাবের প্রধান প্রেরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

তরজমা : আনিকা মাহমুদ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন